অগ্নিঝরা ৭ মার্চের ভাষণ: পটভূমি তাৎপর্য ও আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি: অধ্যক্ষ হামিদুল হক চৌধুরী

সংগ্রহীত

অগ্নিঝরা ৭ মার্চের ভাষণ: পটভূমি তাৎপর্য ও আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি: অধ্যক্ষ হামিদুল হক চৌধুরী

যে ভাষণের মধ্য দিয়ে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান স্বাধীনতার ডাক দিয়েছিলেন, যে ভাষণ গোটা বাঙালি জাতিকে উজ্জ্বীবিত করেছিল একযোগে এবং সর্বোপরি যে ভাষণের কারণে বাঙালি পেল একটি স্বাধীন ভূখণ্ড-সেই ঐতিহাসিক ৭ মার্চের ভাষণকে পেরোতে হয়েছে অজস্র চড়াই-উৎরাই। স্বাধীন বাংলাদেশের ৫০ বছরের প্রায় অর্ধেক সময়ই এই ভাষণ প্রচার কার্যত নিষিদ্ধ ছিল।

বলতে গেলে পঁচাত্তরের ১৫ আগস্ট নৃশংসভাবে জাতির পিতাকে সপরিবারে শহীদ করার পর থেকেই বঙ্গবন্ধু ও মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস মুছে ফেলার অপচেষ্টা হয়েছে। ওই সময় বঙ্গবন্ধু হত্যার প্রতিবাদ যেমন প্রকাশ্যে করা যায়নি, তেমনি বাংলার মাটিতে সম্প্রচার করা যায়নি বঙ্গবন্ধুর ৭ই মার্চের ভাষণ। ১৯৭৬ থেকে ১৯৯৬ সাল পর্যন্ত টানা ২১ বছর কার্যত কারারুদ্ধ ছিল কালজয়ী এ ভাষণ। রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমগুলোর ওপর ভাষণ প্রচারে সরাসরি নিষেধাজ্ঞা ছিল।

মাঝে ৫ বছর (১৯৯৭-২০০১) বঙ্গবন্ধুপ্রেমীরা তাঁর ভাষণ প্রকাশ্যে সম্প্রচার করতে পারলেও ২০০২ সাল থেকে আবারও পাঁচ বছরের জন্য নিষিদ্ধ হয়ে যায় ভাষণ প্রচার।

২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর মানুষ আবার প্রাণভরে ভাষণটি শুনতে পায়। সরকারি ও বেসরকারি গণমাধ্যমে ভাষণের ভিডিও সংস্করণও সম্প্রচার হতে শুরু করে। ইউটিউবসহ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে ‘এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম’। দেরিতে হলেও ভাষণটির ধার বুঝতে পারে আন্তর্জাতিক মহল। আর তাই ২০১৭ সালের ৩০ অক্টোবর ৭ই মার্চের ভাষণকে বিশ্ব প্রামাণ্য ঐতিহ্য হিসেবে স্বীকৃতি দেয় ইউনেস্কো।

আমরা অবাক বিস্ময়ে দেখেছি বঙ্গবন্ধুকে শহীদ করার পর থেকে ১৯৯৬ সালের ২৩ জুন পর্যন্ত এই ভাষণের ভিডিও কেউই দেখতে পাইনি। তখন বিটিভিই ছিল একমাত্র সম্প্রচারমাধ্যম। এই দীর্ঘ ২১ বছরে বিটিভিতে একদিনের জন্যও ভাষণটি সম্প্রচার হয়নি। গণমাধ্যমে বঙ্গবন্ধুর ভাষণ প্রচার নিষিদ্ধ ছিল। ১৯৯৬ সালের ২৩ জুন সন্ধ্যায় প্রথমবার বিটিভিতে বঙ্গবন্ধুর চেহারা দেখি, ভাষণের ভিডিও দেখি। আমার অনেক শিক্ষার্থী পরে আমাকে জানিয়েছে যে, তারা এ ধরনের একজন নেতার কথা শুনে অভিভূত, বিষ্মিত।

বঙ্গবন্ধুর ৭ই মার্চের ভাষণ ছিল একটি অগ্নিমশাল যা বিস্ফোরিত করেছিল মুক্তিযুদ্ধের দাবানল যার সামনে টিকতে পারেনি হানাদার পাকিস্তানি সেনাবাহিনী। জাতির জনকের ৭ই মার্চের ঐতিহাসিক ভাষণ শুধু বাংলাদেশের মানুষের হৃদয়কেই নাড়া দেয়নি, ভাষণটি সারা বিশ্বে আলোড়ন সৃষ্টি করেছিল। এ ভাষণের মধ্য দিয়ে সমগ্র জাতিকে মুক্তির মোহনায় দাঁড় করিয়েছিলেন জাতির জনক। তিনি একটি ভাষণের মধ্য দিয়ে মুক্তিযুদ্ধের সামগ্রিক দিকনির্দেশনা দিয়েছিলেন।

বঙ্গবন্ধু খুব সতর্কতার সঙ্গে বক্তৃতার মাঝখানে চারটি শর্ত আরোপ করে দিলেন। মার্শাল ল’ প্রত্যাহার, সেনাবাহিনী ব্যারাকে ফেরত নেয়া, নির্বাচিত প্রতিনিধির কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর করা এবং যে হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হয়েছে তার বিচার বিভাগীয় তদন্ত করা। এ ৪টি শর্ত দিয়ে একদিকে অলোচনার পথ উন্মুক্ত রাখলেন অপরদিকে বক্তৃতা শেষ করলেন এই কথা বলে যে, “এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম।” তিনি প্রকারান্তরে স্বাধীনতার ঘোষণা দিয়ে মানুষকে মুক্তিযুদ্ধের প্রস্তুতি গ্রহণ করতে বলেন।

ঢাকাস্থ মার্কিন কনসাল জেনারেল আর্চার ব্লাড ঢাকায় অবস্থান করে পরিস্থিতির গুরুত্ব ও বঙ্গবন্ধুর ভাষণের তাৎপর্য ভালোভাবে অনুধাবন করে লিখেছেন, “রোববার ৭ই মার্চ প্রদত্ত মুজিবের ভাষণে তিনি যা বলেছিলেন তার চেয়ে লক্ষণীয় হলো তিনি কি বলেননি। কেউ কেউ আশঙ্কা করছিলেন আবার কেউ কেউ আশা করেছিলেন যে, তিনি বাংলাদেশকে স্বাধীন ঘোষণা করবেন। এর বদলে বাঙালির মুক্তি ও স্বাধীনতার লক্ষে শান্তিপূর্ণ অসহযোগ আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার আহ্বান তিনি জানালেন।” ৭ই মার্চে রেসকোর্স ময়দানের জনসভায় ঘোষণা দেওয়ার পর সাংবাদিক সম্মেলনে তিনি একটি তাৎপর্যপূর্ণ মন্তব্য করেন, “You will see history made if the conspirators fail to come to their senses.” আশ্চর্য, বঙ্গবন্ধুর এই হুঁশিয়ারী উচ্চারণ বছর শেষ হতে না হতেই ফলে গিয়েছিল।

যে ভাষণ শুনলে এখনও মানুষ শিহরণে আপ্লুত হয়, দীর্ঘদিন তা দেশের মানুষকে শুনতে দেওয়া হয়নি। ভাষণটির ভিডিও সংস্করণ তো টানা একুশ বছর কেউ দেখেইনি। অডিও শুনতেও প্রতিকূল পরিস্থিতির মুখে পড়তে হয়েছিল পদে পদে। সম্প্রচারের সময় কেড়ে নেওয়া হয়েছিল মাইক। ভাষণ প্রচারের ‘অপরাধে’ কারাবরণও করতে হয়েছিল অনেককে।

আসুন বঙ্গবন্ধুর ঐতিহাসিক ৭ই মার্চের ভাষণের শিক্ষা ও চেতনাকে ধারণ করে মুজিব শতবর্ষে গণতন্ত্রের মানস কন্যা, সমুদ্র বিজয়ী গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনার হাতকে শক্তিশালী করে ক্ষুধা দারিদ্র্য মুক্ত দেশ গঠনে শামিল হই।

লেখক : চেয়ারম্যান উখিয়া উপজেলা পরিষদ সভাপতি : বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ উখিয়া উপজেলা শাখা।