ইউক্রেনের অভিবাসী ক্যাম্পে জিম্মি ৫ বাংলাদেশি

ইউক্রেনের অভিবাসী ক্যাম্পে জিম্মি ৫ বাংলাদেশি

ইউক্রেনের অভিবাসী ক্যাম্পে ৫ বাংলাদেশিকে জিম্মি করে রাখা হয়েছে। গত শুক্রবার ঢাকার রাশিয়ান দূতাবাস তাদের ভেরিফায়েড টুইটার অ্যাকাউন্টে জার্মান সংবাদমাধ্যম ডয়েচে ভেলের একটি ভিডিও প্রকাশ করে। ভিডিওর ক্যাপশনে লেখা ছিল, ইউক্রেনের অভিবাসী ক্যাম্পে ৫ বাংলাদেশিকে জিম্মি করে রাখা হয়েছে।

এদিকে ইউক্রেনে হামলার শিকার ‘বাংলার সমৃদ্ধি’ জাহাজের ২৮ বাংলাদেশি নাবিক দেশটির শেল্টার হাউস থেকে রোমানিয়ার উদ্দেশে রওনা হয়েছেন। পথিমধ্যে কোনো অনাকাক্সিক্ষত ঘটনা না ঘটলে আজ ভোরে তারা রোমানিয়া পৌঁছাবেন। রোমানিয়া পৌঁছালে তাদের দ্রুত বাংলাদেশে পৌঁছানোর প্রক্রিয়াও শুরু হবে। তবে ফ্রিজিং ভ্যান না পাওয়ায় হামলায় নিহত থার্ড ইঞ্জিনিয়ার হাদিসুর রহমানের মরদেহ অন্য নাবিকদের সঙ্গে নেওয়া সম্ভব হয়নি। আগামী মঙ্গলবার ২৮ নাবিক দেশে পৌঁছাতে পারেন বলে রোমানিয়া ও পোল্যান্ডে অবস্থিত বাংলাদেশ দূতাবাস সূত্র জানিয়েছে।

ডয়েচে ভেলের দেওয়া ভিডিওতে রিয়াদুল মালিক নামে এক বাংলাদেশি উদ্ধারের আকুতি জানিয়ে বলেন, আমরা ইউক্রেনের একটি ক্যাম্পে আটক রয়েছি। এখানে আরও কয়েকজন বাংলাদেশি আছেন। একজন দরজায় পাহারা দিচ্ছেন। তাদের সবার মোবাইল ফোন কেড়ে নেওয়া হয়েছে। আমরা একটি মোবাইল ফোন লুকিয়ে রেখেছি। এই শিবিরকে ইউক্রেনের সেনারা ঘাঁটি বানিয়েছে। রাশিয়া সেনাঘাঁটি দেখে দেখে বোমা ফেলছে। আমরা অনেক ভয়ে আছি। আমাদের আটকে রেখেছে জিম্মির মতো করে। একশর ওপর মানুষ আছে। রাত হলে বোমা ও গুলির শব্দ শুনতে পাই। লাইট বন্ধ করে দিই। আমরা যেখানে তিনজন মানুষ থাকি, সেখানে ১০ জন এনে রেখেছে। আমাদের মারে। আমাদের অনেক মারছে।

ইউক্রেনে অভিবাসী ক্যাম্পে বন্দি ৫ বাংলাদেশিকে নিয়ে প্রশ্ন করলে গতকাল পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. একে আবদুল মোমেন বলেন, ‘বিষয়টি আমরা ভিডিওতে দেখেছি। তাদের তথ্য সংগ্রহ করার চেষ্টা করছি। তারা যে বক্তব্য দিয়েছেন, তাদের জোর করে আটকে রেখেছে ইউক্রেন সরকার এবং মানব ঢাল হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে, সেই তথ্যটি আমরা যাচাই-বাছাই করার চেষ্টা করছি।’

আটকে থাকা ৫ বাংলাদেশির সঙ্গে যোগাযোগ সম্ভব হয়েছে কিনা, এমন প্রশ্নে মন্ত্রী বলেন, ‘আমাদের রাষ্ট্রদূত যিনি দায়িত্বে রয়েছেন, তাকে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।

এদিকে ইউক্রেনে হামলার শিকার ‘বাংলার সমৃদ্ধি’ জাহাজের ২৮ বাংলাদেশি নাবিক আজ ভোরে রোমানিয়া পৌঁছাবেন। সব কিছু ঠিক থাকলে মঙ্গলবার নাগাদ ২৮ নাবিকের বাংলাদেশে ফেরার সম্ভাবনা রয়েছে। পোল্যান্ডে নিযুক্ত বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত সুলতানা লায়লা হোসেন  বলেন, ‘২৮ নাবিক রোমানিয়ার পথে আছেন। আমরা তাদের দ্রুত যেন দেশে পাঠাতে পারি, সেই প্রক্রিয়া শুরু করেছি। যত দ্রুত সম্ভব আমরা তাদের দেশে পাঠিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করছি।’

মঙ্গলবার নাগাদ নাবিকরা দেশে পৌঁছাতে পারেন কিনা, এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, ‘সব কিছু পরিস্থিতির ওপর নির্ভর করছে।’ হাদিসুরের মরদেহ নাবিকদের সঙ্গে আছে কিনা, এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘মরদেহ বহনের জন্য বিশেষ ফ্রিজিং ভ্যানের দরকার হয়। সেটি এখনো জোগাড় করা সম্ভব হয়নি। দ্রুত ফ্রিজিং ভ্যানের ব্যবস্থা করে আমরা মরদেহ নিয়ে আসার ব্যবস্থা করব।’

রোমানিয়ার বাংলাদেশ দূতাবাসের কর্মকর্তা শিকদার মিজানুর রহমান বলেন, ‘জাহাজের ২৮ নাবিক মালদোভা হয়ে রোমানিয়া পৌঁছাবেন। সীমান্তে আমরা বাস প্রস্তুত রেখেছি। আশা করছি স্থানীয় সময় শনিবার মধ্যরাতে (বাংলাদেশ সময় রবিবার ভোর) নাবিকরা রোমানিয়া পৌঁছাবেন। এর পরে পরিস্থিতি বিবেচনায় আমরা সিদ্ধান্ত নেব কবে নাগাদ তাদের দেশে পাঠানো যায়।’

এর আগে ইউক্রেনে শেল্টার হাউসে থাকা ২৮ নাবিককে প্রথমে পোল্যান্ডের রাজধানী ওয়ারশতে নেওয়ার কথা ছিল। কিন্তু নিরাপত্তা বিবেচনায় তাদের রোমানিয়া নেওয়ার পরিকল্পনা করা হয়। জাহাজের ক্যাপ্টেন জিএম নুরে আলম গতকাল রাতে এক ক্ষুদে বার্তায় জানান, তারা নিরাপদে আছেন।

এদিকে গতকাল এক সংবাদ সম্মেলনে নিহত হাদিসুরের ছোট ভাই জাকির হোসেন বলেন, আমার ভাইয়ের লাশ ফেরত চাই। একই সঙ্গে জীবিত ২৮ নাবিককেও দেশে এনে পরিবারের কাছে ফিরিয়ে দিতে হবে। তিনি আরও বলেন, ‘পরিবারে হাদিসুরের উপযুক্ত দুই ভাই আছি। তাদের জন্য একটি ব্যবস্থা করতে প্রধানমন্ত্রীর কাছে আবেদন জানাই।’ জাহাজের সেকেন্ড ইন কমান্ডার রবিউল আউয়ালের বড় ভাই জাকির হোসেন বলেন, ‘জাহাজে ২৮ নাবিক আটকা পড়ে আছে। তাদের দেশে ফিরিয়ে আনতে প্রধানমন্ত্রীর হস্তক্ষেপ কামনা করছি।’

ইউক্রেনে আটকা বাংলাদেশিদের বের করে আনা নিয়ে ভারতের সঙ্গে সমন্বয় নিয়ে প্রশ্ন করা হলে পররাষ্ট্রমন্ত্রী একে আবদুল মোমেন গতকাল বলেন, ‘ভারতের সঙ্গে ক্রমাগত আলোচনা করছি। ভারত আমাদের সহায়তা করছে।’ বাংলাদেশি জাহাজে কে আক্রমণ করেছিল, সে বিষয়ে প্রশ্ন করলে তিনি বলেন, এ বিষয়ে আমাদের কাছে কোনো তথ্য এখনো নেই। তবে রাশিয়ার রাষ্ট্রদূত এ জন্য দুঃখপ্রকাশ করেছেন।

ইউক্রেনে রাশিয়ার অভিযান নিয়ে বাংলাদেশের অবস্থান সম্পর্কে প্রশ্ন করলে একে আবদুল মোমেন বলেন, আমাদের অবস্থান এখনো আগের জায়গায় রয়েছে। আমরা বিশ্বে শান্তি ও স্থিতিশীলতা চাই। বাংলাদেশের স্বার্থে আমরা শান্তি চাই। আমরা শান্তিপূর্ণভাবে সব বিবাদ মীমাংসার আহ্বান জানিয়েছি। আমরা জাতিসংঘেও জানিয়েছি যে আমরা এ পরিস্থিতি নিয়ে গভীরভাবে উদ্বিগ্ন। এ জন্য জাতিসংঘের মহাসচিবকে দায়িত্ব নিতে আহ্বান জানিয়েছি। আমরা বলেছি যে জাতিসংঘের সনদে আমরা বিশ্বাস করি। সনদ অনুযায়ী অন্য দেশের সার্বভৌম ও অখণ্ডতার কথা বলেছি।’

শান্তির পক্ষে থাকার পরে ভোটদানে বিরত থাকা নিয়ে প্রশ্ন করলে তিনি বলেন, ‘আমরা শান্তি চাই। সে জন্য আমরা যুদ্ধ চাই না। আমরা যুদ্ধের বিরুদ্ধে।’ রাশিয়ার সঙ্গে আর্থিক লেনদেন কতদিন বন্ধ থাকতে পারে- এমন প্রশ্নের জবাবে পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ‘আমরা বিভিন্ন তথ্য পাচ্ছি। বিষয়গুলো অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে বিচার-বিশ্লেষণ করব।’ রূপপুর বিদ্যুৎকেন্দ্র প্রকল্প নিয়ে প্রশ্ন করলে তিনি বলেন, ‘বিষয়গুলো নিয়ে আরও বিস্তারিত তথ্য আসবে। দেশের মঙ্গলের জন্য যা করা দরকার, সেটি করা হবে। আগে থেকে কিছু বলা যাবে না।