ইউপি নির্বাচন: নৌকার অর্ধেক প্রার্থী হেরেছেন

ইউপি নির্বাচন: নৌকার অর্ধেক প্রার্থী হেরেছেন

নির্বাচন কমিশনের বেসরকারি ফলাফলে উঠে এসেছে, এবারে ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) চতুর্থ ধাপের নির্বাচনে নৌকা প্রতীকের প্রার্থীদের প্রায় অর্ধেকই (৪৯.৭৪%) হেরে গেছেন। গত রবিবার ভোট হওয়া ৮৩৮টি ইউপির মধ্যে ৭৯৬টির বেসরকারি ফলাফল জানিয়েছে ইসি। এর মধ্যে নৌকা প্রতীকের প্রার্থী জিতেছেন ৩৯৬টি ইউপিতে। শতকরা হিসাবে যা মোট ইউনিয়নের ৪৯.৭৪ শতাংশ।

ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে ২০১৬ সাল থেকে শুধু চেয়ারম্যান পদে দলীয় প্রতীকে নির্বাচন হচ্ছে।

আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের নেতারা নৌকার হারের পেছনে নিজেদের অনৈক্যকে বড় কারণ মনে করছেন। কারণ, প্রায় ১৬০টি ইউনিয়নে চেয়ারম্যান পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতাই গড়তে পারেননি নৌকার প্রার্থী।

আওয়ামী লীগের স্থানীয় সরকার মনোনয়ন বোর্ডের সদস্য আব্দুর রহমান বলেন, ‘প্রতি ইউনিয়নে আমরা একজনকে মনোনয়ন দিই, কিন্তু এখানে মনোনয়নপ্রত্যাশী থাকেন পাঁচ-সাতজন। মনোনয়ন না পেলেই অনেকের চরিত্র বদলে যায়। দলের পক্ষে যেভাবে ভূমিকা রাখা দরকার, তাঁরা তা রাখেন না। ফলে নৌকা হেরে যায়। আবার স্থানীয় সরকার নির্বাচনে আঞ্চলিকতা, আত্মীয়তাসহ অনেক বিষয় কাজ করে। এ কারণেও অনেক জায়গায় নৌকা হেরে যায়। তবে এতসংখ্যক নৌকার প্রার্থীর হারে আমরা বিব্রত। ’

নির্বাচনের ফল বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, ৭৯৬টি ইউপির মধ্যে ৩৯০টি বা ৪৮.৯৯ শতাংশ ইউপিতে স্বতন্ত্র প্রার্থীরা জিতেছেন। তাঁদের মধ্যে আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী ও বিএনপির স্বতন্ত্র প্রার্থীও রয়েছেন। বিএনপি এই নির্বাচনে দলের কাউকে মনোনয়ন না দেওয়ায় স্থানীয় নেতাকর্মীরা বেশ কিছু ইউপিতে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছেন। আওয়ামী লীগ ও স্বতন্ত্রের বাইরে জাতীয় পার্টি ছয়টি এবং ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ দুটি, জাতীয় পার্টি (জেপি) ও জাকের পার্টি একটি করে ইউপিতে জয়ী হয়েছে।

এই নির্বাচনে ভোটের আগেই ক্ষমতাসীন দলের চেয়ারম্যান পদপ্রার্থী ৪৮টি ইউপিতে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হন। বিনা ভোটের ৪৮ ইউপি চেয়ারম্যান ধরে ৭৯৬টির ফল জানিয়েছে ইসি। বাকি ইউপির ফল স্থগিত আছে। এবার নারীদের সংরক্ষিত ওয়ার্ডের সদস্য পদে ১১২ জন এবং সাধারণ ওয়ার্ডের সদস্য পদে ১৩৫ জন বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হন।

চতুর্থ ধাপে চেয়ারম্যান পদে ৭৯০টি ইউপিতে ভোট হয়। তবে এই ফল বিশ্লেষণ করা হয় বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত ৪৮ ইউপি ধরে মোট ৮৩৮টি ইউপির। এর মধ্যে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আখাউড়ায় পাঁচটি, শরীয়তপুরে ১৯টি ও মাদারীপুরে ৯টি ইউপিতে আওয়ামী লীগ কোনো প্রার্থীকে নৌকা প্রতীক দেয়নি। এসব ইউপি সবার জন্য উন্মুক্ত রাখা হয়। সে কারণে ওই ৩৩টি ইউপিতে এবার সবাই স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে জিতেছেন। এই ৩৩ ইউপি ছাড়াও ১৬৩টি ইউপিতে বিজয়ী প্রার্থীর নিকট প্রতিদ্বন্দ্বীও ছিলেন না নৌকা প্রতীকের প্রার্থীরা। বেশ কিছু ইউপিতে নৌকা প্রতীকের প্রার্থীরা জামানত হারিয়েছেন।

আগের তিন ধাপের ফল : নির্বাচন কমিশনের তথ্য অনুসারে এর আগে গত ২৮ নভেম্বর অনুষ্ঠিত তৃতীয় ধাপের নির্বাচনে চেয়ারম্যান পদে নৌকা প্রতীকের প্রার্থীদের প্রায় ৪৭ শতাংশ হেরে যায়।

তৃতীয় ধাপে ভোটের আগেই ক্ষমতাসীন দলের চেয়ারম্যান পদপ্রার্থীরা ১০০টি ইউপিতে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হন। এ ছাড়া নারীদের সংরক্ষিত ওয়ার্ডের সদস্য পদে ১৩২ এবং সাধারণ ওয়ার্ডের সদস্য পদে ৩৩৭ জন বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হন। চট্টগ্রামের রাউজানের ১৪টি ইউপিতে চেয়ারম্যান, সাধারণ সদস্য ও সংরক্ষিত ওয়ার্ডের নারী সদস্য—সব কয়টি পদেই আওয়ামী লীগের মনোনীত প্রার্থীরা বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হন।

১১ নভেম্বর অনুষ্ঠিত দ্বিতীয় ধাপের নির্বাচনে নৌকা প্রতীকের চেয়ারম্যান পদপ্রার্থীদের ৫৮.২৭ শতাংশ জয়ী হয়। বাকি প্রায় ৪২ শতাংশ ইউপিতে চেয়ারম্যান হন স্বতন্ত্র প্রার্থীসহ অন্যরা। দ্বিতীয় ধাপের এই হিসাবে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় জয়ী ৮১ জনও রয়েছেন। এই ধাপে জাতীয় পার্টি ১০টি, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ চারটি এবং জাতীয় পার্টি (জেপি), খেলাফত মজলিস, জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল (জাসদ) ও বাংলাদেশ জাতীয় পার্টির প্রার্থীরা একটি করে ইউপিতে জয়ী হন।

প্রথম ধাপের দুই দফায় গত ২১ জুন ও ২০ সেপ্টেম্বর অনুষ্ঠিত নির্বাচনে নৌকা প্রতীকের প্রার্থীরা ৭৩.৪৮ শতাংশ ইউপিতে জয়ী হয়েছিলেন। এর মধ্যে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় ৭২টিতে জয়ী হন। স্বতন্ত্র প্রার্থীরা জয়ী হন ৮৮টিতে। এ ছাড়া জাতীয় পার্টি তিনটি, জাতীয় পার্টি (জেপি) তিনটি এবং ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ ও বাংলাদেশ ওয়ার্কার্স পার্টির প্রার্থীরা একটি করে ইউপিতে জেতেন।

স্থানীয় সরকার বিভাগের সাবেক সচিব আবু আলম মো. শহীদ খান বলেন, যে পরিস্থিতিতে নির্বাচন হচ্ছে, তাতে ক্ষমতাসীন দলের প্রার্থীদের জয়ী হওয়ার সুযোগ বেশি। কিন্তু দেখা যাচ্ছে, দলের বিদ্রোহীরা অনেক ইউপিতে জয়ী হচ্ছেন। এতে প্রমাণ হয়, দল থেকে অনেক ক্ষেত্রে এলাকায় যোগ্য প্রার্থীকে মনোনয়ন দেওয়া হচ্ছে না। মনোনয়ন বাণিজ্য এ ক্ষেত্রে কাজ করতে পারে। কিছু ক্ষেত্রে তৃণমূলের মূল্যায়নকে বিবেচনায় না নিয়ে সংসদ সদস্যরা তাঁদের পছন্দের প্রার্থীকে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছেন।