কোম্পানীগঞ্জে চলমান ‘বন্দুকযুদ্ধ-সংঘর্ষ’ কে দেখবে কে থামাবে

সংগ্রহীত

কোম্পানীগঞ্জে চলমান ‘বন্দুকযুদ্ধ-সংঘর্ষ’ কে দেখবে কে থামাবে

নোয়াখালীর কোম্পানীগঞ্জ উপজেলায় ছয় মাস ধরে ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগের দুই পক্ষের চলমান গুলি বিনিময়-সংঘর্ষে এক সাংবাদিকসহ দুজন প্রাণ হারিয়েছেন। গুলিবিদ্ধ-আহত হয়েছেন অনেকে।

সর্বশেষ গত বৃহস্পতিবার রাতে উপজেলার চরএলাহী ইউনিয়নে স্থানীয় আওয়ামী লীগের দুপক্ষের অনুসারীদের মধ্যে ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া ও সংঘর্ষের ঘটনায় আট জন গুলিবিদ্ধ হন।

বসুরহাট পৌরসভার মেয়র আবদুল কাদের মির্জা ও কোম্পানীগঞ্জ উপজেলা আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক মিজানুর রহমান বাদলের অনুসারীদের পাল্টাপাল্টি অবস্থান, অস্ত্র ও বোমাবাজি এবং একের পর এক রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষে এই এলাকাটি পরিণত হয়েছে একটি আতঙ্কের জনপদে।

কিন্তু গণমাধ্যমে খবর প্রকাশের পাশাপাশি এসব ঘটনা দিনের পর দিন দেশজুড়ে আলোচনা তৈরি করলেও সংঘাত থামাতে কিংবা উপজেলায় রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা আনার ক্ষেত্রে কোনো ধরনের প্রশাসনিক কিংবা সাংগঠনিক উদ্যোগ এখন পর্যন্ত দৃশ্যমান হয়নি। দৃশ্যমান হয়নি আইনশৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনীর কোনো উদ্যোগ। কীভাবে প্রকাশ্যে দুপক্ষ অস্ত্র যুদ্ধে লিপ্ত হচ্ছেন, অস্ত্র-গুলির উৎস কী? সেদিকে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নজর আছে, তা বলার সুযোগ নেই।

গত বছরের ডিসেম্বরের শেষ ভাগে বসুরহাট পৌরসভা নির্বাচনের সময় বিভিন্ন বিস্ফোরক বক্তব্য দিয়ে আলোচনায় আসেন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদেরের ছোট ভাই আবদুল কাদের মির্জা। কাদের মির্জা একপর্যায়ে ওবায়দুল কাদের ও তার স্ত্রীর বিরুদ্ধে তাকে (কাদের মির্জা) হত্যার ষড়যন্ত্রের অভিযোগও করেন। কাদের মির্জার এসব কর্মকাণ্ডে স্থানীয় পর্যায়ে দলে দ্বিধাবিভক্তি দেখা দেয়।

ফলে উপজেলা আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক ও উপজেলা পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান মিজানুর রহমান বাদলের নেতৃত্বে দলে একটি পৃথক বলয় সৃষ্টি হয়। একে একে ওই বলয়ের সঙ্গে যুক্ত হন উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি খিজির হায়াত খান, সাধারণ সম্পাদক নুর নবী চৌধুরীসহ জেলা আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতারা।

কোম্পানীগঞ্জে ছয় মাসেরও বেশি সময় ধরে চলা এমন অস্থিতিশীল পরিস্থিতি সামলাতে দলের পক্ষ থেকে কোনো উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে কি না জানতে চাইলে গতকাল শুক্রবার তিনি দ্য ডেইলি স্টারকে বলেন, ‘আমি আগেও বলেছি, এটা যেহেতু আমাদের দলের সাধারণ সম্পাদকের (ওবায়দুল কাদের) নিজের পরিবার, নিজের আসন, নিজের বাড়ি, সেহেতু বিষয়টি তিনিই দেখছেন। এখানে আমরা কোনো কথা বলতে চাই না। এটা শোভনও না আমাদের জন্য।’

সংঘর্ষ, হামলা, বোমাবাজিসহ কোম্পানীগঞ্জে আওয়ামী লীগের দুপক্ষের নানাবিধ কর্মকাণ্ডের জন্য আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতির বিষয়ে কথা হয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি মো. শামসুল হক টুকুর সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘এটা অনাকাঙ্ক্ষিত একটা বিষয়। এ ধরনের ঘটনা আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীদের করা ঠিক না। কারণ এই সংগঠনটি জনগণের কল্যাণের জন্য, সেবার জন্য। এখন দলের নেতা-কর্মীরাই যদি এমন কাজ করেন তাহলে জনগণ আতঙ্কিত থাকে, উদ্বিগ্ন থাকে। তাতে সংগঠনের ঐতিহ্য নষ্ট হয়।’

উপজেলার পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে কোনো উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে কি না জানতে চাইলে সাবেক এই স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী দ্য ডেইলি স্টারকে বলেন, ‘এটা আমার জানা নেই।’

টুকু আরও বলেন, ‘তবে কেউ আইনশৃঙ্খলার অবনতি ঘটালে বা সমাজবিরোধী কোনো কাজে যুক্ত হলে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী যে তাদের নিজ অবস্থানে থাকবে, এটুকু আমি বলতে পারি।’

কোম্পানীগঞ্জের সংঘাতময় পরিস্থিতি নিয়ে নোয়াখালীর অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মো. আলমগীর হোসেনের বক্তব্য, ‘আসলে কিছু কিছু ব্যাপার আছে যেগুলো পলিটিক্যাল…। আমরা তো আর পলিটিকসটা নিয়ন্ত্রণ করি না।’

কোম্পানীগঞ্জ উপজেলা আওয়ামী লীগের মুখপাত্র মাহবুবুর রশীদ মঞ্জুর ভাষ্য, সংকট সমাধানে উপজেলা আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে কয়েকবার উদ্যোগ নেওয়া হলেও তা ফলপ্রসূ হয়নি। তিনি বলেন, ‘কিছুদিন আগে দলের চট্টগ্রাম বিভাগের সাংগঠনিক সম্পাদক আবু সাঈদ আল মাহমুদ স্বপনের মাধ্যমে আমরা মাননীয় প্রধানমন্ত্রীকে বিষয়টি জানিয়েছি। সেখানেও কোনো সমাধান ওবায়দুল কাদের সাহেবের কারণে হয়নি। তিনি ইউ টার্ন নিয়েছেন তার ভাইকে রক্ষার জন্য।’

উপজেলা আওয়ামী লীগের সদস্য মঞ্জু একইসঙ্গে ওবায়দুল কাদের ও কাদের মির্জার ভাগনে। তিনি আরও বলেন, ‘তিন দিন আগে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি খায়রুল আনম চৌধুরী সেলিম দেখা করেছেন। প্রধানমন্ত্রী তাকে (জেলা আ. লীগ সভাপতি) স্পষ্ট মেসেজ দিয়েছেন তাকে (কাদের মির্জা) বলে দেওয়ার জন্য, যেন সে পৌরসভা নিয়ে থাকে। দল নিয়ে, দলের নেতা-কর্মীদের সঙ্গে সে (কাদের মির্জা) যদি বাড়াবাড়ি করে, তাহলে তার বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’

এ ব্যাপারে কথা বলতে শুক্রবার বিকালে নোয়াখালী জেলার আওয়ামী লীগের সভাপতি এ এইচ এম খায়রুল আনম চৌধুরীর মুঠোফোনে কয়েক বার কল করা হলেও তিনি ফোন ধরেননি।

গতকাল সন্ধ্যায় বসুরহাট পৌরসভার মেয়র আব্দুল কাদের মির্জার মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে ওই প্রান্ত থেকে একজন বলেন, ‘স্যার এখন ঘুমাচ্ছেন।’