খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে বিএনপির ৩৮ বছর

খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে বিএনপির ৩৮ বছর

১৯৮০ সালের ৩০ মে বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা ও রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানকে যখন হত্যা করা হয় তখন খালেদা জিয়া ছিলেন নিতান্তই একজন গৃহবধূ। দুই শিশু সন্তানকে (তারেক রহমান পিনু ও আরাফাত রহমান কোকো) নিয়ে তখন তিনি ঢাকা সেনানিবাসে বাস করছিলেন। জিয়াউর রহমানকে হত্যার পর বিএনপি তখন বিপর্যস্ত, দিশেহারা। এ পরিস্থিতিতে ৭৮ বছর বয়সী ভাইস প্রেসিডেন্ট বিচারপতি আব্দুস সাত্তার দলের দায়িত্ব নেন। কিন্তু তার বার্ধক্য এবং দল পরিচালনার ধরন নিয়ে অসন্তোষ দেখা দেয় বিএনপিতে। দলের একাংশ তখন খালেদা জিয়াকে রাজনীতিতে আনার পরিকল্পনা করে। কিন্তু খালেদা জিয়া রাজি ছিলেন না। তৎকালীন যুবদল নেতা ও বর্তমান বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য গয়েশ্বরচন্দ্র রায় জানান, এক পর্যায়ে নেতাকর্মীদের চাপে সিদ্ধান্ত পাল্টান খালেদা জিয়া।

বিএনপির বিভিন্ন পর্যায়ের নেতা ও দলের ওয়েবসাইট সূত্রে জানা যায়, ১৯৮২ সালের ৩ জানুয়ারি একজন কর্মী হিসেবে খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক আত্মপ্রকাশ ঘটে। সেদিন তিনি বিএনপির প্রাথমিক সদস্যপদ গ্রহণ করেন। ওই বছরের ২৪ মার্চ তৎকালীন সেনাপ্রধান এইচএম এরশাদ সামরিক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে রাষ্ট্রপতি আব্দুস সাত্তারকে ক্ষমতাচ্যুত করেন। এই অবস্থায় আব্দুস সাত্তার আনুষ্ঠানিকভাবে বিএনপির চেয়ারম্যান থাকলেও দল পরিচালনায় খালেদা জিয়ার প্রভাব বাড়তে থাকে।

পরের বছরের মার্চে খালেদা জিয়া দলের সিনিয়র ভাইস-চেয়ারম্যান হন এবং এপ্রিলের প্রথমে বিএনপির এক বর্ধিত সভায় তিনি ভাষণ দেন। কয়েক মাসের মাথায় দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান হন তিনি। এরশাদবিরোধী আন্দোলনেও সক্রিয় হয়ে ওঠেন। ১৯৮৪ সালের ১০ মে খালেদা জিয়া বিএনপির চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন।

বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, এই ১০ মে আমাদের কাছে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়া ১৯৮৪ সালের এই দিনে বিএনপির চেয়ারম্যানের পূর্ণাঙ্গ দায়িত্ব লাভ করেছিলেন। এই দীর্ঘ ৩৮ বছর তিনি এই দলের নেতৃত্ব দিচ্ছেন। এর মধ্যে তিনি জনগণের সমর্থন নিয়ে, ভালোবাসা নিয়ে জনগণের ভোটে তিন তিনবার দলকে রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্বে নিয়ে এসেছেন। দুবার বিরোধী দলের নেতার ভূমিকা পালন করেছেন।

৮০’র দশকে জেনারেল এরশাদের সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে আন্দোলনের মাধ্যমে দেশজুড়ে খালেদা জিয়ার ব্যাপক পরিচিত গড়ে ওঠে। তৎকালীন যুবদল নেতা গয়েশ্বরচন্দ্র রায় বলেন, গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারে খালেদা জিয়ার আপসহীন নেতৃত্বের প্রতি তখনকার ছাত্র ও যুবসমাজ মুহূর্তের মধ্যে ঐক্যবদ্ধ হয়ে যায়। নানা ষড়যন্ত্রের পাশাপাশি আন্দোলন চলাকালে কয়েকবার তাকে আটক করা হয়। কিন্তু আন্দোলন থেকে সরে যাননি খালেদা জিয়া। জাতিকে ঐক্যবদ্ধ করে গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের সফল আন্দোলন দেশবাসীকে উপহার দেন তিনি। এরশাদের পতনের পর ১৯৯১ সালের জাতীয় নির্বাচনে বিএনপি জয়লাভ করে। রাজনীতিতে আসার ১০ বছরের মধ্যেই প্রধানমন্ত্রী হন খালেদা জিয়া। তিনি দেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী।

এ প্রসঙ্গে গয়েশ্বর বলেন, তখন আমাদের তেমন কোনো নির্বাচনী প্রস্তুতিও ছিল না। শুধু ম্যাডামের (খালেদা জিয়া) নেতৃত্বের গুণাবলির কারণে সেদিন বিএনপি সরকার গঠন করেছিল। তার রাজনৈতিক জীবনে যতগুলো নির্বাচনে অংশ নিয়েছেন, সবগুলোতেই জয়লাভ করেছেন।

২০০১-০৬ সাল পর্যন্ত ক্ষমতায় থাকা অবস্থায় খালেদা জিয়ার সরকারকে নানা বিতর্কের মধ্যে পড়তে হয়। ২০০৭ সালের ওয়ান-ইলেভেন সরকারের আমল থেকে এখন পর্যন্ত ক্ষমতার বাইরে রয়েছে দলটি। ২০০৮ সালের জাতীয় নির্বাচনে অংশ নিলেও বিএনপি পরাজিত হয়। ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারি নির্বাচন বর্জন করে দলটি। ২০১৮ সালের ৮ ফেব্রুয়ারি দুর্নীতির মামলায় খালেদা জিয়ার সাজা হয়। ওই বছরের ৩০ ডিসেম্বরের নির্বাচনে তাকে কারাগারে রেখেই নির্বাচনে অংশ নেয় বিএনপি।

করোনা সংক্রমণ পরিস্থিতিতে পরিবারের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে ২০২০ সালের ২৫ মার্চ সরকার সাজা স্থগিত করে খালেদা জিয়াকে শর্তসাপেক্ষে মুক্তি দেয়। এই অবস্থায় গুলশানের ভাড়া বাসা ফিরোজায় করোনা আক্রান্ত হলে তার শারীরিক অবস্থার অবনতি ঘটে। কয়েক দফা তাকে হাসপাতালে যেতে হয়। লিভার সিরোসিসে আক্রান্ত খালেদা জিয়া বর্তমানে চিকিৎসকদের পরামর্শে বাসায় চিকিৎসা নিচ্ছেন।

মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, সারাটা জীবন ধরেই গণতন্ত্রের মা বেগম খালেদা জিয়া গণতন্ত্রকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিতে গণতন্ত্রের পক্ষে সংগ্রাম করেছেন। কয়েক বছর ধরে কারা অন্তরীণ আছেন। এখন তিনি গৃহবন্দি হয়ে আছেন। তারপরও তিনি গণতন্ত্রের জন্য লড়াই করে চলেছেন। আমরা আজকে এই দিনটিতে তাকে শুভেচ্ছা জানাচ্ছি, অভিনন্দন জানাচ্ছি, দীর্ঘায়ু কামনা করছি। একই সঙ্গে অবিলম্বে তাকে মুক্তি দিয়ে দেশে গণতান্ত্রিক পরিবেশ সৃষ্টি করার দাবিও জানান বিএনপি মহাসচিব।