জামানত হারাতে যাচ্ছেন নৌকার ২৯ প্রার্থী

এ ধরনের ফলাফলকে আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় ও স্থানীয় নেতারা দেখছেন ভরাডুবি হিসেবে। কেন এমনটা হলো, এই নিয়ে দলের ভেতর চলছে বিশ্লেষণ। এখন পর্যন্ত যেসব কারণ সামনে এসেছে, এর মধ্যে বিদ্রোহী প্রার্থীর আধিক্য ও দলীয় কোন্দল অন্যতম। কেউ কেউ বলছেন, প্রার্থী বাছাই সঠিক হয়নি। ফলে নেতা-কর্মীদের বড় অংশ বিদ্রোহী কিংবা স্বতন্ত্র প্রার্থীর পক্ষে কাজ করেছে।

সুনামগঞ্জে তিন উপজেলার ২১টি ইউপিতে ভোট হয়েছে। এর মধ্যে দিরাই ও বিশ্বম্ভরপুর উপজেলায় আওয়ামী লীগের পাঁচ চেয়ারম্যান প্রার্থী জামানত রক্ষা করার মতো ভোটও পাননি। এর মধ্যে বিশ্বম্ভরপুর উপজেলার ধনপুর ইউপিতে নৌকার প্রার্থী হযরত আলী ১ হাজার ১১৬ ভোট এবং ফতেপুর ইউপিতে হেলাল উদ্দিন ওরফে দুলাল মাত্র ৭৯৫ ভোট পেয়ে জামানত হারাতে যাচ্ছেন। হেলাল উদ্দিনের ভাষ্য, তিনি দলের ইউনিয়ন কমিটির সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক ছাড়া আর কাউকে পাশে পাননি। সবাই বিদ্রোহী প্রার্থীর পক্ষে ছিলেন।

দিরাই উপজেলায় নৌকার প্রার্থীদের মধ্যে ভাটিপাড়া ইউপিতে মাহমুদুল হাসান চৌধুরী ১ হাজার ২৭১ ভোট, কুলঞ্জ ইউপিতে মিলন মিয়া ১ হাজার ৭৮১ ভোট ও সরমঙ্গল ইউপিতে রঞ্জিত রায় ১ হাজার ১৪ ভোট পেয়ে জামানত খোয়াতে যাচ্ছেন।

দলীয় প্রার্থীদের এই ভরাডুবি প্রসঙ্গে সুনামগঞ্জ জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক এনামুল কবির বলেন, ‘অনেক ইউপিতে সঠিক প্রার্থী আমরা মনোনয়ন দিতে পারিনি। আবার বিদ্রোহী প্রার্থীদের কারণে অনেকের পরাজয় হয়েছে।’

মৌলভীবাজার সদর ও রাজনগর উপজেলায় ২০টি ইউনিয়নের ১৩টিতে নৌকা হেরে গেছে। এর মধ্যে জামানত হারানোর পথে আছেন পাঁচজন। তাঁরা হলেন মোস্তফাপুর ইউপিতে মো. খছরু আহমদ (৭৮৪ ভোট), কামালপুর ইউপিতে আবদুর রহমান (৬০১ ভোট), গিয়াসনগর ইউপিতে মো. ছুরুক মিয়া (১ হাজার ৬১৪ ভোট), টেংরা ইউপিতে মোহাম্মদ মাহমুদ উদ্দিন (২৩৪ ভোট) ও উত্তরভাগ ইউপিতে মো. সোহেল আলম (৯১৮ ভোট)।

সিলেটের বিয়ানীবাজার ও গোলাপগঞ্জ উপজেলায় ২০টি ইউপিতে নির্বাচন হয়েছে। এর মধ্যে চার ইউপিতে নৌকার প্রার্থীরা জামানত হারাতে যাচ্ছেন। তাঁরা হলেন বিয়ানীবাজারের তিলপাড়া ইউপির এমাদ উদ্দিন (৯২০ ভোট), গোলাপগঞ্জের ঢাকা দক্ষিণ ইউপির নজরুল ইসলাম (৪৭৮ ভোট), লক্ষ্মীপাশা ইউপির মাহমুদ আহমদ চৌধুরী (৩৪৬ ভোট), লক্ষণাবন্দ ইউপিতে মো. আবদুল করিম খান (১৩৯ ভোট)।

সিলেট জেলা আওয়ামী লীগের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি শফিকুর রহমান চৌধুরী, নৌকার প্রার্থীর পরাজয় ও জামানত বাজেয়াপ্তের পেছনে তৃণমূল থেকে যোগ্য ও শক্ত প্রার্থী বাছাই করতে না পারা একটি কারণ হতে পারে।

গাইবান্ধার গোবিন্দগঞ্জ উপজেলার ১৬টি ইউপিতে নির্বাচন হয়েছে। এর মধ্যে চারটিতে আওয়ামী লীগের প্রার্থীরা জামানত হারাতে যাচ্ছেন। তাঁরা হলেন রাজাহার ইউপিতে আবদুল লতিফ সরকার (৫৪০ ভোট), রাখালবুরুজ ইউপিতে নুরজাহান বেগম (১ হাজার ৪১ ভোট), নাকাই ইউপিতে মোকছেদুল আমিন (৫৯৬ ভোট) ও সাপমারা ইউপিতে মো. সামীম রেজা (৫৩২ ভোট)। এঁদের মধ্যে রাখালবুরুজ ইউপির নৌকার প্রার্থী নুরজাহান বেগমের দাবি, দলের নেতা-কর্মীদের অসহযোগিতার কারণে তিনি পরাজিত হয়েছেন।

সাতক্ষীরার শ্যামনগরের ৯ ইউপির মধ্যে নৌকা জয় পেয়েছে মাত্র দুটিতে। বাকি সাতটির মধ্যে তিনটিতে জামানত হারাচ্ছেন আওয়ামী লীগের প্রার্থীরা। তাঁরা হলেন আটুলিয়া ইউপিতে আওয়ামী লীগের সভাপতি গাজী নজরুল ইসলাম (৬৯৩ ভোট), রমজাননগর ইউপিতে ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সদস্য শাহানুর আলম (৬৯৫ ভোট) ও কাশিমাড়ী ইউপি আওয়ামী লীগের সভাপতি সমশের ঢালী (১ হাজার ৫২৬ ভোট)।

দিনাজপুরের কাহারোল উপজেলার সুন্দরপুর ইউপিতে আওয়ামী লীগের চেয়ারম্যান প্রার্থী শরিফউদ্দিন আহমেদ মাত্র ৭০৩ ভোট পেয়ে জামানত খোয়াতে যাচ্ছেন। শরিফউদ্দিন আহমেদ দাবি করেন, ‘ভোটের তিন দিন আগপর্যন্ত মাঠ ভালো ছিল। জনগণ আমার সঙ্গে ছিল। কিন্তু শেষ মুহূর্তে দলীয় নেতা-কর্মীদের অসহযোগিতার কারণে হেরে গেছি।’

ব্রাহ্মণবাড়িয়ার বিজয়নগর উপজেলা পরিষদ নির্বাচনের পর এবার ইউপি নির্বাচনেও আওয়ামী লীগের প্রার্থীর ভরাডুবি হয়েছে। ইউপি নির্বাচনে চেয়ারম্যান পদে নৌকার প্রার্থী এফতেহারুল ইসলাম ১ হাজার ৪২৬ ভোট পেয়ে জামানত হারাতে যাচ্ছেন।

ফরিদপুরের বোয়ালমারী উপজেলার ১০টি ইউপি নির্বাচনে ৯টিতেই আওয়ামী লীগের নৌকা প্রতীকের প্রার্থীরা পরাজিত হয়েছেন। পরাজিত ৯ প্রার্থীর মধ্যে জামানত হারিয়েছেন ৩ জন। তাঁরা হলেন চতুল ইউপিতে খন্দকার আবুল বাশার, গুনবাহা ইউপিতে কামরুল ইসলাম ও দাদপুর ইউপিতে শেখ সাজ্জাদুর রহমান। সঠিক প্রার্থীকে মনোনয়ন না দেওয়া এবং দলীয় কোন্দলের কারণে এমন ভরাডুবি হয়েছে বলে দলীয় নেতাদের মত।

নড়াইলের লোহাগড়া উপজেলার লাহুড়িয়া ইউপিতে আওয়ামী লীগের প্রার্থী এস এম আনিছুজ্জামান নৌকা প্রতীক নিয়ে মাত্র ১১৮ ভোট পেয়ে জামানত খোয়াতে যাচ্ছেন। এ ইউপিতে চেয়ারম্যান নির্বাচিত হয়েছেন আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী প্রার্থী এস এম কামরুল। তিনি পেয়েছেন ৮ হাজার ২৬২ ভোট।

কক্সবাজারের চকরিয়ার চিরিঙ্গা ইউনিয়নে নৌকার প্রার্থী মো. শাহ নেওয়াজ ৬৭টি ভোট পেয়েছেন। এ ইউনিয়নে ৩ হাজার ৬৫৫ ভোট পেয়ে চেয়ারম্যান নির্বাচিত হয়েছেন আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী প্রার্থী জামাল হোসেন চৌধুরী। তিনি কক্সবাজার-১ (চকরিয়া-পেকুয়া) আসনের সাংসদ জাফর আলমের আত্মীয়। তিনি চিরিঙ্গা ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সভাপতি।

আওয়ামী লীগের প্রার্থী শাহ নেওয়াজ অভিযোগ করেন, তাঁকে নৌকার প্রার্থী হিসেবে মনোনয়ন দেওয়া হলেও আওয়ামী লীগ, অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনের কোনো নেতা-কর্মী তাঁর পক্ষে নির্বাচনী প্রচারণায় অংশ নেননি। সাংসদ জাফর আলমের ইশারা ও ভয়ভীতিতে দলীয় নেতা-কর্মীরা নৌকার বিপক্ষে কাজ করেছেন। ফলে নৌকার ভরাডুবি হয়েছে।

এই বিষয়ে একাধিকবার যোগাযোগ করেও সাংসদ জাফর আলমের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

একই উপজেলায় এর আগে তৃতীয় ধাপের নির্বাচনে কৈয়ারবিল ইউনিয়নে নৌকা প্রতীকের চেয়ারম্যান প্রার্থী জান্নাতুল বকেয়া পেয়েছিলেন মাত্র ৯৯ ভোট।

নীলফামারীর সৈয়দপুর উপজেলার খাতামধুপুর ইউপিতে নৌকার প্রার্থী হাসিনা বেগম ভোট পেয়েছেন মাত্র ৯৩টি। ওই ইউনিয়নে ৭ হাজার ৪০৫ ভোট পেয়ে চেয়ারম্যান নির্বাচিত হয়েছেন আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী প্রার্থী মাসুদ রানা ওরফে পাইলট।

আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় সূত্র বলছে, তৃণমূল পর্যায়ে বিভেদ এবং ইউপি ভোটে নৌকার প্রার্থীদের বেশি সংখ্যায় পরাজয় দলের নীতিনির্ধারকদের ভাবিয়ে তুলেছে। জাতীয় নির্বাচনের আগে সমস্যা চিহ্নিত করে সমাধান করা না গেলে আরও বড় ক্ষতির আশঙ্কা রয়েছে।

আওয়ামী লীগের অন্যতম যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আ ফ ম বাহাউদ্দিন নাছিম  বলেন, নৌকার ভোট তো এত কম হওয়ার কথা নয়। কেন এমনটা হয়েছে, সেই কারণ খুঁজে বের করা হচ্ছে। এখন পর্যন্ত যা জানা যাচ্ছে, তাতে অনেকেই দলীয় প্রার্থীর বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছেন। এর মধ্যে বড় বড় নেতা-সাংসদ থাকার তথ্যও এসেছে। কোথাও কোথাও প্রার্থীদের বিষয়ে ভুল তথ্য আসার কারণে কম জনপ্রিয় প্রার্থী মনোনয়ন পেয়ে গেছেন। তিনি বলেন, দলীয় প্রার্থীর পরাজয়ের কারণ খুঁজে বের করার জন্য দায়িত্বপ্রাপ্ত বিভাগীয় সাংগঠনিক সম্পাদকদের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।