বঙ্গবন্ধু টানেল, বাধা কাটিয়ে পুরোদমে কাজ

সংগ্রহীত

দেশে প্রথমবারের মতো কোনো নদীর তলদেশে নির্মাণাধীন এই টানেলের নামকরণ করা হয়েছে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান টানেল। এতে ব্যয় হচ্ছে ১০ হাজার ৩৭৪ কোটি টাকা। টানেল নির্মিত হলে দেশের জিডিপি শূন্য দশমিক ১৬৬ শতাংশ বাড়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

টানেলের প্রকল্প পরিচালক হারুনুর রশীদ চৌধুরী প্রথম আলোকে বলেন, নির্মাণকাজ শুরুর আগে-পরে করোনা মহামারি ও জমি অধিগ্রহণ নিয়ে জটিলতা ছিল। এখন আর তা নেই। তাই আশা করা যাচ্ছে, টানেল আগামী দেড় বছরের মধ্যে যান চলাচলের উপযোগী হয়ে যাবে।

মূল টানেলের দৈর্ঘ্য ৩ দশমিক ৩২ কিলোমিটার। এর মধ্যে টানেলের প্রতিটি টিউবের দৈর্ঘ্য ২ দশমিক ৪৫ কিলোমিটার এবং ব্যাস ১০ দশমিক ৮০ মিটার। প্রতিটি টিউবে দুটি করে মোট চারটি লেন থাকবে। মূল টানেলের সঙ্গে পশ্চিম ও পূর্ব প্রান্তে ৫ দশমিক ৩৫ কিলোমিটার সংযুক্ত সড়ক থাকবে। আর রয়েছে ৭২৭ মিটার দীর্ঘ ওভারব্রিজ।

২০০৮ সালে সংসদ নির্বাচনের আগে চট্টগ্রামের লালদীঘি মাঠে নির্বাচনী সমাবেশে এই টানেল নির্মাণের প্রতিশ্রুতি দেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। আওয়ামী লীগ নির্বাচিত হয়ে ক্ষমতায় আসার পর এই টানেল নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়।

প্রকল্পসংশ্লিষ্ট প্রকৌশলীরা জানান, প্রকল্পটি বাস্তবায়নের জন্য ২০১২ সালে সেতু কর্তৃপক্ষ, চায়না কমিউনিকেশন কনস্ট্রাকশন কোম্পানি লিমিটেড (সিসিসিসিএল) ও অভি অরূপ অ্যান্ড পার্টনার্স হংকং লিমিটেড যৌথভাবে টানেল নির্মাণের কারিগরি ও অর্থনৈতিক সমীক্ষা করে। এরপর ২০১৪ সালের জুন মাসে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার চীন সফরকালে দুই দেশের মধ্যে জিটুজি ভিত্তিতে (সরকারের সঙ্গে সরকারের) সমঝোতা স্মারক সই হয়। চীন সরকারই সিসিসিসিএলকে এই টানেল নির্মাণের জন্য মনোনীত করে। এ বিষয়ে ওই বছরের ৩০ জুন সেতু কর্তৃপক্ষ ও সিসিসিসির মধ্যে বাণিজ্যিক চুক্তি সই হয়।

প্রকল্পসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ভাষ্য, কর্ণফুলী নদীর দক্ষিণ পাড় থেকে কক্সবাজার পর্যন্ত অর্থনৈতিক অঞ্চল, গভীর সমুদ্রবন্দর ও বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের কাজ এগিয়ে যাচ্ছে। এসব কর্মযজ্ঞ চলছে টানেলকে ঘিরে। এই টানেলের বহুমুখী সুবিধা নেওয়ার অপেক্ষায় এখন সবাই। আর টানেলকে ঘিরে চট্টগ্রাম-কক্সবাজারের পর্যটনশিল্পের বিকাশ ঘটবে।

টানেলে যান চলাচল শুরু হলে ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে আসা কক্সবাজার ও দক্ষিণ চট্টগ্রামগামী গাড়িগুলোকে আর নগরে প্রবেশ করতে হবে না। চট্টগ্রাম সিটি আউটার রিং রোড হয়ে টানেলের মাধ্যমে দ্রুত সময়ের মধ্যে গন্তব্যে পৌঁছাতে পারবে। এর ফলে চট্টগ্রাম নগরেও যানবাহনের চাপ কমে যাবে।

প্রকল্পের অগ্রগতি

এখন পর্যন্ত বড় অগ্রগতি হচ্ছে দুটি টিউবের মধ্যে একটির খননকাজ শেষ হওয়া। খননকাজ শেষ হওয়া টিউবে সড়কের নির্মাণকাজ শুরু হয়েছে। গত মে পর্যন্ত ৭৮৮ মিটার রাস্তার কাজ শেষ হয়েছে। দ্বিতীয় টিউবের খননকাজ চলছে। এখন পর্যন্ত ১ হাজার ৬১০ মিটারের খননকাজ সম্পন্ন হয়েছে।

এ ছাড়া টানেলের পতেঙ্গা প্রান্তে ফ্লাড গেটের নির্মাণকাজ শেষ হয়েছে। টানেলের সঙ্গে সংযুক্তকারী দুটি রাস্তার নির্মাণকাজ চলমান রয়েছে। আর আনোয়ারা প্রান্তে ৭২৭ মিটার দীর্ঘ ওভারব্রিজের কাজও অনেকটা এগিয়ে গেছে।

প্রকল্পের মাসিক অগ্রগতি প্রতিবেদন অনুযায়ী, চলতি বছরের মে পর্যন্ত প্রকল্পের ভৌত অগ্রগতি হয়েছে ৬৮ দশমিক ৭৫ শতাংশ।

মহামারি করোনার কারণে প্রকল্পের অগ্রগতি প্রত্যাশিত হয়নি বলে জানান প্রকল্পসংশ্লিষ্ট প্রকৌশলীরা। তাঁরা জানান, ২০২০ সালের ২৬ মার্চ থেকে ২০২১ সালের এপ্রিল পর্যন্ত কাজের অগ্রগতি ছিল মাত্র ১৫ শতাংশ।

প্রকল্পের সঙ্গে যুক্ত প্রকৌশলীরা জানান, গত বছর করোনার কারণে কাজের অগ্রগতি যথেষ্ট ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল। কেননা প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে চীনের ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান। আর টানেলের বিভিন্ন ধরনের নির্মাণ উপকরণ সামগ্রী চীন থেকে আনা হয়। করোনার কারণে তাতে প্রভাব পড়ে। আর গত বছর করোনা সংক্রমণ শুরু হওয়ার পর সীমিত পরিসরে কাজ অব্যাহত রাখা হয়েছিল। কিন্তু প্রথমবার লকডাউনের কারণে কাজ সেভাবে এগিয়ে নেওয়া সম্ভব হয়নি।

এই মুহূর্তে প্রকল্পের গুরুত্বপূর্ণ কাজের মধ্যে সংযোগ সড়কের কাজ চলছে। আর প্রয়োজনীয় ৩৮২ দশমিক শূন্য ৮ একর জমির মধ্যে ইতিমধ্যে ৩৬২ দশমিক ৩২ একর অধিগ্রহণ করা হয়েছে। বাকি জমিও দ্রুত অধিগ্রহণের প্রক্রিয়া চলছে।

সম্প্রতি নগরের পতেঙ্গা প্রান্তে প্রকল্প এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, টানেলের প্রথম টিউবের ভেতরে সড়ক নির্মাণের জন্য ঢালাইয়ের কাজ চলছে। টানেলের প্রবেশমুখ এলাকায় সংযোগ সড়কের নির্মাণকাজ অব্যাহত রয়েছে।

সরেজমিনে দেখা যায়, টানেলের আনোয়ারা প্রান্তে চাতরী চৌমুহনী পর্যন্ত ৫ দশমিক ৩৫ কিলোমিটার সংযোগ সড়কের মাটি ভরাটের কাজ চলছে। তবে এখনো পুরোপুরি শেষ হয়নি। পাশাপাশি সিইউএফএল–সংলগ্ন এলাকায় ৭২৭ মিটার একটি ওভারব্রিজের নির্মাণকাজ প্রায় শেষের দিকে। ইতিমধ্যে স্থাপন করা হয়েছে স্প্যান ও গার্ডার।

এর বাইরে প্রকল্প এলাকায় বিভিন্ন স্থাপনা (রিসোর্ট এরিয়া ও সার্ভিস এরিয়া) তৈরির জন্য সিইউএফএলের পূর্ব পাশে চলছে অবকাঠামোর কাজ।

এদিকে টানেল সংযোগ সড়ক থেকে শিকলবাহা ওয়াই জংশন পর্যন্ত ছয় লেনের কাজ শুরু হয়েছে। সড়ক সম্প্রসারণের অংশ হিসেবে গাছ কাটা ও মাটি ভরাট শুরু হয়েছে।

বেড়েছে ব্যয় ও মেয়াদ

জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) ২০১৫ সালের নভেম্বরের সভায় ‘কনস্ট্রাকশন অব মাল্টি লেন রোড টানেল আন্ডার দ্য রিভার কর্ণফুলী’ শীর্ষক টানেল প্রকল্পের অনুমোদন দেওয়া হয়। এতে প্রকল্পের মেয়াদ নির্ধারণ করা হয়েছিল ২০২০ সালের জুন এবং ব্যয় ধরা হয় ৮ হাজার ৪৪৬ কোটি ৬৩ লাখ টাকা। প্রকল্প বাস্তবায়নের জন্য সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয় থেকে প্রশাসনিক অনুমোদন দেওয়া হয় ওই বছরের ২৯ ডিসেম্বর।

প্রকল্প অনুমোদনের তিন বছর পর ২০১৯ সালের ২৪ ফেব্রুয়ারি কর্ণফুলী নদীর তলদেশে টানেলের নির্মাণকাজের উদ্বোধন করেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। আর গত বছরের ১২ ডিসেম্বর দ্বিতীয় টিউবের উদ্বোধন করেন সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের।

তবে প্রকল্পের নির্মাণকাজ শুরুর পর মেয়াদ ও ব্যয় দুটিই বেড়েছে। এখন প্রকল্পের মেয়াদ আড়াই বছর বাড়িয়ে ২০২২ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত করা হয়। আর ১ হাজার ৯২৭ কোটি টাকা ব্যয় বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১০ হাজার ৩৭৪ কোটি টাকায়।

নির্মাণকাজ শেষের দুই বছর থেকে ঋণ পরিশোধ শুরু হবে বলে জানান প্রকল্প পরিচালক হারুনুর রশীদ চৌধুরী। প্রকল্পের মেয়াদ ও ব্যয় বাড়লেও তা মানতে রাজি নন তিনি। তাঁর দাবি, প্রকল্পের শুরুতে প্রতি ডলারের বিপরীতে বাংলাদেশি টাকা ছিল ৮০ টাকা। এখন ৮৩ টাকা। এ ছাড়া সেবা সংস্থার পাইপলাইন স্থাপনসহ আনুষঙ্গিক কিছু কাজ ডিপিপিতে (উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাবনা) প্রথমে ধরা হয়নি। পরে তা যুক্ত হয়। এসব কারণে ব্যয় বেড়েছে বলে মনে হচ্ছে। যদিও তা বেশি নয়। আর ২০১৫ সালে প্রকল্পের অনুমোদন হলেও কাজ শুরু হয়েছে ২০১৭ সালের ডিসেম্বরে। সে হিসাবে ৫ বছর শেষ হবে ২০২২ সালের ডিসেম্বরে।

কর্ণফুলী টানেলের নির্মাণকাজ নিয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে বাংলাদেশ অর্থনীতি সমিতির সাবেক সভাপতি মইনুল ইসলাম প্রথম আলোকে বলেন, করোনা মহামারির কারণে প্রকল্পের কাজ কিছুটা বিলম্বিত হয়েছে। তবে এখন কাজের অগ্রগতি খুব ভালো। মিরসরাই শিল্পাঞ্চল হয়ে কক্সবাজারের মাতারবাড়ী পর্যন্ত সমুদ্রের পাড়ে মেরিন ড্রাইভ হয়ে গেলে যোগাযোগব্যবস্থার জন্য কর্ণফুলী টানেল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে। মেরিন ড্রাইভ হলে তখন টানেলের পূর্ণ সুবিধা পাওয়া যাবে।

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের এই সাবেক অধ্যাপক বলেন, টানেলের কারণে নদীর আনোয়ারা প্রান্তে চায়না ইপিজেডসহ বিভিন্ন শিল্পাঞ্চল গড়ে উঠছে। এখন চাইলে বন্দরও তাদের কিছু কার্যক্রম নদীর ওই প্রান্তে স্থানান্তর করতে পারে।