বন্যায় ডুবে থাকা সিলেটে বিশুদ্ধ পানির সংকট

বন্যায় ডুবে থাকা সিলেটে বিশুদ্ধ পানির সংকট

টানা অতিবর্ষণ, পাহাড়ি ঢল আর উজানের পানিতে সিলেটের ১৩ উপজেলার ৮টিই এখন ভয়াবহ বন্যাকবলিত। বাকি ৫ উপজেলায় আংশিক পানি ঢুকেছে। বিভাগীয় নগরীর প্রায় অর্ধেক রাস্তা তলিয়ে গেছে পানির নিচে। কোমর পানি সিলেট নগরীর বেশিরভাগ বাসা-বাড়িতে। অথচ পানিতে তলিয়ে থাকা নগরীতে দেখা দিয়েছে বিশুদ্ধ পানির সংকট।

জানা গেছে, বন্যার পানিতে সিলেট নগরের মেন্দিবাগ এলাকায় অবস্থিত সিটি করপোরেশনের পানি বিশুদ্ধকরণ (ওয়াটার ট্রিটমেন্ট) প্ল্যান্ট তলিয়ে গেছে। ফলে প্ল্যান্টটি থেকে পানি সরবরাহ বন্ধ হয়ে গেছে। পাশাপাশি চারটি পাম্পও তলিয়ে যাওয়ায় পানি সরবরাহ করা যাচ্ছে না। এর ফলে নগরে কয়েকটি এলাকার পানিবন্দি মানুষ সুপেয় পানির সংকটে ভুগছেন। এ ছাড়া জেলার বিভিন্ন উপজেলায় মানুষের বাড়ির টিউবওয়েলটি বন্যার পানিতে তলিয়ে যাওয়ায় তারা খাবার পানির সমস্যায় পড়েছেন।

নগরের কলাপাড়া এলাকার বাসিন্দারা জানান, খাবার পানির জন্য বৃষ্টির পানি ধরে রেখে সেগুলো কাপড়ে ছেঁকে পাত্রে রাখছেন। এরপর সেই পানি ফিটকিরি দিয়ে বিশুদ্ধ করে পান করবেন।

৯ দিন ধরে বন্যায় প্লাবিত সিলেটের সদর উপজেলাসহ কানাইঘাট, কোম্পানীগঞ্জ, গোয়াইনঘাট, জকিগঞ্জ ও জৈন্তাপুরের পরিস্থিতির আরও অবনতি হয়েছে। শুধু শহর আর এসব উপজেলাই নয়; গত সোমবার নতুন করে প্লাবিত হয়েছে দক্ষিণ সুরমা ও ফেঞ্চুগঞ্জ উপজেলা। এক কথায় সিলেটে বর্তমানে ভয়াবহ রূপ নিয়েছে বন্যা পরিস্থিতি। বন্যাকবলিত এলাকার রাস্তাঘাট, ঘরবাড়ি, কমিউনিটি ক্লিনিক ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এখন ডুবোচর। নিরাপদ আশ্রয়ে ছুটছেন মানুষ।

সিলেটের জকিগঞ্জ উপজেলা দিয়ে প্রবল বেগে পানি ঢুকছে। ফলে প্লাবিত হচ্ছে একের পর এক এলাকা। উপজেলার অমলশিদ এলাকায় সুরমা ও কুশিয়ারা নদীর উৎসস্থলের একটি ডাইক (নদী প্রতিরক্ষা বাঁধ) ভেঙে যাওয়ায় এ সমস্যার সৃষ্টি হয়েছে। এর ফলে সিলেটের বন্যা পরিস্থিতির আরও অবনতির আশঙ্কা রয়েছে। বৃহস্পতিবার রাত সাড়ে ১২টার দিকে এই ভাঙনের ঘটনা ঘটে।

এদিকে একের পর এক বিপদের সম্মুখীন হচ্ছেন হাওরপারের মানুষরা। বিপদ যেন আঁকড়ে ধরেছে তাদের। ফসলের ক্ষতির পর এবার ভারী বর্ষণ ও পাহাড়ি ঢলে শান্তিগঞ্জ উপজেলার নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়েছে। রাস্তাঘাট ও ঘরবাড়ি তলিয়ে যাওয়ায় দুর্ভোগে নাকাল উপজেলার পানিবন্দি পরিবাগুলো। নলকূপ, গোচারণ ভূমি পানিতে প্লাবিত হওয়ায় গোখাদ্য নিয়েও দুশ্চিন্তায় পড়েছেন তারা।

নগরীর শাহজালাল উপশহর, সোবহানীঘাট, কালীঘাট, ছড়ারপাড়, শেখঘাট, তালতলা, মাছিমপুর, পাঠানটুলা, লন্ডনি রোড, সাগরদিঘির পাড়, সুবিদবাজার, শিবগঞ্জ, মেজরটিলা, মদিনা মার্কেট, দক্ষিণ সুরমার বঙ্গবীর রোড, মোমিনখলাসহ বিভিন্ন এলাকা এখন বন্যাকবলিত। উজানে বৃষ্টি না থামলে বন্যা পরিস্থিতির আরও অবনতি হবে বলে আশঙ্কা সংশ্লিষ্টদের।

পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) জানায়, সিলেটে সুরমা ও কুশিয়ারা নদীর পানি বিপদসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। গত বুধবার কানাইঘাট পয়েন্টে পানির প্রবাহ ৬ সেন্টিমিটার কমলেও সিলেটে বেড়েছে ২ সেন্টিমিটার। নগরে ও গ্রামে পানি বৃদ্ধি অব্যাহত রয়েছে।

সিলেট জেলা প্রশাসন সূত্রমতে, বন্যার্তদের জন্য ২৭৪টি আশ্রয়কেন্দ্র প্রস্তুত করা হয়েছে। এর মধ্যে ৭৮টিতে মানুষ অবস্থান করছেন। সিলেট সিটি করপোরেশন সূত্রমতে, মহানগরীতে এ পর্যন্ত ১৬টি আশ্রয়কেন্দ্র খোলা হয়েছে। এর মধ্যে ১০টিতে বন্যার্তরা আশ্রয় নিয়েছেন। এসব কেন্দ্রে শুকনো খাবার পাঠানো হয়েছে।

জকিগঞ্জে সুরমা-কুশিয়ারার বেড়িবাঁধে ভাঙন জকিগঞ্জ (সিলেট) প্রতিনিধি জানান, জকিগঞ্জে নতুন করে সুরমা ও কুশিয়ারা নদীর বেড়িবাঁধ ভেঙে পানি প্রবেশ করছে লোকালয়ে। প্লাবিত হচ্ছে নতুন গ্রাম। বাড়ছে বন্যার্ত মানুষের সংখ্যাও। নদীর পানি বৃদ্ধি পাওয়াতে কোনোভাবেই রক্ষা করা যাচ্ছে না ডাইকের ভেড়িবাঁধ।

কসকনকপুর ইউপির মৌলভীরচকে সুরমা নদীর বাঁধ ভেঙে প্রবল গতিতে পানি ঢুকছে। এ ছাড়া মুন্সিবাজার মাদ্রাসার সামনেও রয়েছে মারাত্মক ঝুঁকি। বারঠাকুরী ইউপির দিঘালিগ্রামে বেড়িবাঁধের ওপর দিয়ে পানি ঢুকছে। ওই ইউনিয়নে ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় রয়েছে অলিঘড় ও শাহ শরিফ মাজার সংলগ্ন কুশিয়ারা নদীর বাঁধ। এদিকে সুলতানপুর ইউনিয়নের রহিমপুর, ভক্তিপুর গ্রামের মধ্যখানে স্থানীয়দের সব প্রচেষ্টার ওপর দিয়ে পানি ঢুকতে শুরু করেছে।

সুনামগঞ্জে বন্যার কিছুটা উন্নতি আমাদের সুনামগঞ্জ প্রতিনিধি জানান, ভারতের চেরাপুঞ্জি ও বাংলাদেশের উত্তর পূর্বাঞ্চলে বৃষ্টিপাত কম হওয়ায় সুনামগঞ্জের বন্যা পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি রয়েছে। গত ২৪ ঘণ্টায় সুরমার পানি ৮ সেন্টিমিটার কমে গতকাল শুক্রবার বিকাল ৬টায় বিপদসীমার ১০ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে ৭.৯০ সেন্টিমিটারে প্রবাহিত হয়। বৃষ্টিপাত না হলে বন্যা পরিস্থিতির উন্নতি হবে বলে জানিয়েছেন সুনামগঞ্জ পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. জহুরুল ইসলাম।

স্থানীয়ভাবে বিভিন্ন এলাকায় খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, এখনো রাস্তাঘাট, বাড়িঘর, হাটবাজার, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, ধর্মীয় উপাসনালয়ে বন্যার পানি থাকায় ভোগান্তিতে পড়েছেন সুনামগঞ্জ সদর, বিশ্বম্ভরপুর, তাহিরপুর, ছাতক ও দোয়ারাবাজার উপজেলার লক্ষাধিক মানুষ। ২২২টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ও ৪৮টি মাধ্যমিক বিদ্যালয় বন্যাকবলিত হয়েছে। বন্যার পানিতে ৪৫০টির বেশি পুকুর তলিয়ে গেছে। এতে প্রায় ৩৫ টন মাছ, ৩০ লাখ মাছের পোনা ভেসে গিয়ে প্রায় আড়াই কোটি টাকার ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে।

হাওরের তীর ও নিচু এলাকায় এখন অনেক কাঁচা ঘরবাড়ি ও রাস্তাঘাটে পানি রয়েছে। কোথাও পানি বৃদ্ধি পেয়েছে। গ্রামের অনেকের কাঁচা ঘরবাড়ি তলিয়ে যাওয়ায় বিশুদ্ধ পানি না পাওয়া রান্নার দুর্ভোগে পড়েছেন। গোয়াল ঘরে পানি ঢুকে যাওয়ায় গরু-বাছুর নিয়ে দুর্ভোগে পড়েছেন।

পর্যটকদের হাওরে ভ্রমণে সতর্কতা তাহিরপুর (সুনামগঞ্জ) প্রতিনিধি জানান, সুনামগঞ্জের নদনদী, পর্যটন স্পটগুলো পানিতে কানায় কানায় পরিপূর্ণ হওয়ায় হাওর ভ্রমণে সতর্কতা জারি করেছেন তাহিরপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. রায়হান কবির।

তিনি শুক্রবার সকাল জানান, বর্তমানে দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়া বিরাজ করছে এবং এ সময় নদী ও হাওরের পানিতে প্রচুর ঢেউ হচ্ছে, যা চলাচলকারী নৌকাগুলোর জন্য ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে। পাশাপাশি ব্যাপক বজ্রপাত হচ্ছে। ফলে দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়ার সময় নদী/হাওরে ভ্রমণ হতে বিরত থাকার জন্য সংশ্লিষ্ট সবাইকে বিশেষ করে পর্যটকদেরকে অনুরোধ করা হলো।

হবিগঞ্জে খোয়াই নদীর পানি বিপদসীমা ছুঁই ছুঁই এদিকে হবিগঞ্জ প্রতিনিধি জানান, ভারতের ত্রিপুরা রাজ্যের পাহাড়ি ঢলে খোয়াই নদীর পানি দ্রুত বৃদ্ধি পাচ্ছে। চুনারুঘাট উপজেলার সীমান্তবর্তী বাল্লা পয়েন্টে নদীর পানি বিপদসীমা ছুঁই ছুঁই করছে। পানি উন্নয়ন বোর্ড কন্ট্রোল রুম সূত্র জানায়, গত কয়েক ঘণ্টায় নদীর পানি ক্রমান্বয়ে বৃদ্ধি পাচ্ছে। গতকাল দুপুর ১২টায় বাল্লা পয়েন্টে নদীর পানি বিপদসীমার ১০ সেন্টিমিটার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হয়। বেলা ৩টায় শায়েস্তগগঞ্জ পয়েন্টে ২৩ সেন্টিমিটার ও মাছুলিয়া পয়েন্টে ১৫ সেন্টিমিটার পানি বৃদ্ধি পায়।