বিটুমিন জালিয়াতি: ২০ ট্রাক ফিরিয়ে এনে পুরো চালান জব্দ

সংগ্রহীত

বিটুমিন জালিয়াতি: ২০ ট্রাক ফিরিয়ে এনে পুরো চালান জব্দ

সনদ জালিয়াতির মাধ্যমে চট্টগ্রাম বন্দর থেকে ছাড়িয়ে নেওয়া সব বিটুমিনই ১৯ ঘণ্টার মধ্যে বন্দরে ফেরত এনেছে চট্টগ্রাম কাস্টমস। একইসঙ্গে পুরো চালান জব্দ করা হয়েছে।

তদন্তের পর এ বিষয়ে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

আমদানি করা বিটুমিন মানসম্পন্ন না হওয়ায় জাল সনদ তৈরি করে কাস্টমসকে বোকা বানিয়ে সোমবার ড্রামভর্তি ২০ ট্রাক বিটুমিন ছাড় করে নিজেদের গুদামে নিয়ে গিয়েছিল আমদানিকারক ‘ন্যাশনাল ডেভলপমেন্ট ইঞ্জিনিয়ার্স লিমিটেড’। ধরা না পড়লে পর্যায়ক্রমে তারা বাকি বিটুমিনও ছাড় করে নিয়ে যেতো। কিন্তু তার আগেই জাল সনদের বিষয়টি চট্টগ্রাম কাস্টমস কর্মকর্তাদের কাছে ধরা পড়ে। ফলে আমদানি করা বাকি বিটুমিন আটকে দেওয়া হয়। একইসঙ্গে ছাড় নেওয়া নিন্মমানের ২০ ট্রাক বিটুমিন ফিরিয়ে দেওয়ার নির্দেশ দেয় চট্টগ্রাম কাস্টমস।

সোমবার থেকে মঙ্গলবার সকাল পর্যন্ত টানা অভিযান চালিয়ে ছাড়িয়ে নেওয়া বিটুমিনের ট্রাকের বহর ফিরিয়ে আনতে সক্ষম হয়েছে কাস্টমস কর্তৃপক্ষ।

ন্যাশনাল ডেভেলপমেন্ট ইঞ্জিনিয়ার্স (এনডিই) সম্প্রতি প্রায় এক লাখ টন বিটুমিন আমদানি করে। এরপর ইস্টার্ন রিফাইনারিতে পরীক্ষায় পণ্যটি মান পরীক্ষায় ফেল করে। কিন্তু আমদানিকারক প্রতিষ্ঠান প্রকৃত সনদ আড়াল করে ভুয়া সনদ দিয়ে বন্দর থেকে পণ্য খালাসের প্রক্রিয়া শুরু করে। ৫০টি কনটেইনারের মধ্যে ৯টি ছাড় করে নিয়ে যায় তারা।

গত সোমবার বন্দর থেকে বিকেল চারটা নাগাদ এই বিটুমিন ছাড় হয়; ফেরত আনতে মোট সময় লাগে ১৯ ঘণ্টা। বর্তমানে ওই আমদানিকারকের আনা সব বিটুমিন বেসরকারি কন্টেইনার ডিপো ‘চিটাগাং কন্টেইনার ট্রান্সপোর্টেশন কোম্পানি লিমিটেড’ এ আটক আছে।

কাস্টমস সূত্র জানায়, আমদানি করা বিটুমিন নিম্নমানের। এ কারণে ইস্টার্ণ রিফাইনারির নামে মান সনদ জাল করে কাস্টমসে জমা দেয় আমদানিকারকের নিয়োজিত সিঅ্যান্ডএফ এজেন্ট সান শাইন এজেন্সি।

জালিয়াতির মাধ্যমে নিম্নমানের বিটুমিন ছাড়ের চাঞ্চল্যকর ঘটনা উদঘাটন করতে একটি তদন্ত কমিটি গঠন করে দিয়েছেন চট্টগ্রাম কাস্টমস কমিশনার মোহাম্মদ ফখরুল আলম। তিন সদস্য বিশিষ্ট তদন্ত কমিটির প্রধান কাস্টমসের অতিরিক্ত কমিশনার। বাকি দুইজন হলেন, একজন উপ কমিশনার ও একজন সহকারী কমিশনার। তারা তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেওয়ার পরই আইনগত পদক্ষেপ নেওয়া হবে।

এর আগে ঘটনার ‘নাটের গুরু’ সিঅ্যান্ডএফ এজেন্ট চট্টগ্রামের তাহের চেম্বারের সান শাইন এজেন্সির বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার প্রথম পদক্ষেপ হিসেবে কারণ দর্শানোর নোটিশ প্রদান করা হয়েছে।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে চট্টগ্রাম কাস্টমসের সহকারী কমিশনার উত্তম চাকমা বাংলানিউজকে বলেন, ছাড় হওয়া ২০ ট্রাক বিটুমিন পুনরায় ফেরত আনা হয়েছে। ফেরত আনার ক্ষেত্রে তারা নানা গড়িমসি করছিল। এরপরও ফেরত আনতে আমাদের মঙ্গলবার সকাল ১১টা পর্যন্ত সময় লেগেছে। সব বিটুমিনই অক্ষত অবস্থায় ফেরত আনা হয়েছে।

তিনি বলেন, ইস্টার্ণ রিফাইনারির নামে জমা দেওয়া নকল মান সনদও যাচাই-বাছাই করেছে ইস্টার্ণ রিফাইনারি কর্তৃপক্ষ। আমি লিখিতভাবে সেটি গ্রহণ করেছি। জালিয়াতি করে ভুয়া সনদ দিয়ে পণ্য ছাড়ের পর ‘ন্যাশনাল ডেভলপমেন্ট ইঞ্জিনিয়ার্স লিমিটেড’ এর সব আমদানিকৃত চালান পরীক্ষার দাবি উঠেছে। প্রশ্ন উঠেছে এভাবেই তারা আগেও নিম্নমানের বিটুমিন আমদানি করে বাজারে ছেড়েছে। এতে সরকারের কোটি কোটি টাকা গচ্চা গেছে।

জানতে চাইলে চট্টগ্রাম কাস্টমস কমিশনার মোহাম্মদ ফখরুল আলম বাংলানিউজকে বলেন, বিটুমিনের মান নিশ্চিত করতে বাধ্যতামূলক সনদ যাচাইয়ের জন্য বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের এসআরও জারি হয়েছে ২৫ মে থেকে। এরপর আমদানি হয়ে আসা সব চালানের মান সনদই আমরা যাচাই করছি। এর আগে চালানের ক্ষেত্রে আমাদের মান যাচাইয়ের সুযোগ ছিল না। ২৫ মের পর থেকে এ আমদানিকারক এবং অন্য আমদানিকারকের চালান ছাড়ে আমরা বাড়তি সতকর্তা আরোপ করেছি। ল্যাব পরীক্ষায় মান উত্তীর্ণ না হওয়ায় ওই আমদানিকারকের সব বিটুমিন আটক থাকবে।

নিম্নমানের বিটুমিন আমদানি নিয়ে জাতীয় সংসদে ক্ষোভ
ভুয়া সনদে নিম্মমানের বিটুমিন খালাসের বিস্ময়কর ঘটনাটি তদন্তের জোর দাবি উঠেছে জাতীয় সংসদেও। মঙ্গলবার অর্থবিল পাসের আগে সংশোধনী প্রস্তাবের ওপর আলোচনায় অংশ নিয়ে বিটুমিনের প্রসঙ্গ তোলেন বিএনপির সংসদীয় দলের নেতা মো. হারুনুর রশিদ।

তিনি বলেন, পত্রপত্রিকায় এক মাস ধরে বিটুমিন নিয়ে নিউজ হচ্ছে। অথচ কোনো পদক্ষেপ নেই। ভুয়া সনদ নিয়ে জাহাজ থেকে নিম্নমানের বিটুমিন খালাস করা হচ্ছে। কারা এই নিম্নমানের বিটুমিন আনছে? এর বিরুদ্ধে অবশ্যই ব্যবস্থা নিতে হবে। ’

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দৃষ্টি আকর্ষণ করে এই সংসদ সদস্য আরও বলেন, রাস্তা নির্মাণ ও মেরামতে বিটুমিন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ উপকরণ। দীর্ঘদিন ধরে বিদেশ থেকে নিম্নমানের বিটুমিন আমদানি হয়ে আসছে। ভুয়া সনদ দিয়ে বন্দর থেকে বিটুমিনের চালান খালাসও হচ্ছে। এটি খুবই উদ্বেগজনক বিষয়।

হারুনুর রশিদ বলেন, এখানে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী এবং সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রী আছেন। আমি প্রধানমন্ত্রীর কাছে আবেদন জানাচ্ছি, এ বিষয়টি খতিয়ে দেখা উচিত। আজকের পত্রিকায়ও লিড নিউজ হয়েছে। যেহেতু গণমাধ্যমে বিষয়টি উঠে এসেছে, আমি মনে করি এ বিষয়ে সঠিক তদন্ত হওয়া উচিত।

উল্লেখ্য, দেশে নিম্নমানের বিটুমিন আমদানির অভিযোগ দীর্ঘদিনের। দিনের পর দিন নিম্নমানের বিটুমিন আমদানি হলেও মান নিয়ে কারো কোনো মাথাব্যথা ছিল না। ফলে সড়ক রক্ষণাবেক্ষণে হাজার কোটি টাকা গচ্চা যাচ্ছিল সরকারের। সর্বশেষ গত ২৫ মে বিটুমিনের মান নিশ্চিত করতে  তিনটি নির্ধারিত ল্যাবে মান পরীক্ষা বাধ্যতামূলক করে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়। এরপর থেকেই মূলত নিম্নমানের বিটুমিন আমদানির চক্রটি বিপাকে পড়ে। মান যাচাই বাধ্যতামূলক করার পর এই প্রথম কোনো চালান ধরা পড়লো কাস্টমসের হাতে।

জানা গেছে, ‘ন্যাশনাল ডেভলপমেন্ট ইঞ্জিনিয়ার্স লিমিটেড’- এর আমদানি করা বিটুমিন ল্যাব পরীক্ষায় ফেল করে। নমুনা পরীক্ষায় চালানটি দুটি শ্রেণিতে মান উত্তীর্ণ হয়নি। এরমধ্যে গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে- পেনিট্রেশনে সেটি ৭২ পয়েন্ট পেয়েছে। কিন্তু চালানটি ৬০-৭০ গ্রেডের মধ্যে থাকার কথা। অর্থাৎ মান অনুযায়ী ২ পয়েন্ট বেশি। আর সফটেনিং শ্রেণীতেও ঘোষণার চেয়ে কম পয়েন্ট পাওয়া গেছে। এই অবস্থায় সেটি ঘোষিত মান অনুযায়ী হয়নি বলে মত দিয়েছে ইস্টার্ণ রিফাইনারি। কিন্তু জালিয়াতির মাধ্যমে মান উত্তীর্ণ সনদ বানিয়ে তা কাস্টমসে জমা দেয় আমদানিকারক ও সিঅ্যান্ডএফ এজেন্ট। জাল সনদে সূত্র নম্বর থেকে শুরু করে প্যাড, স্বাক্ষর সবকিছুই জাল করা হয়েছে।

জানা গেছে, আমদানিকৃত পণ্যের মান বিভিন্ন ল্যাবরেটরিতে নমুনা পরীক্ষা যাচাইয়ের পর সেটি ম্যানুয়ালি এবং ইমেইলে পাঠানোর নিয়ম আছে। বিএসটিআই এই নিয়ম পালন করলেও ইস্টার্ন রিফাইনারির ক্ষেত্রে সেই নিয়ম মানা হয়নি। এই কারণেই জাল সনদ তৈরির সুযোগ পেয়েছে আমদানিকারক ও সিঅ্যান্ডএফ এজেন্ট।

জানতে চাইলে মান সনদ দেওয়া প্রতিষ্ঠান ইস্টার্ণ রিফাইনারির উপ মহাব্যবস্থাপক (মান নিয়ন্ত্রণ) জাহিদুল ইসলাম বলেন, আমরা সবসময় সরকারিভাবে আমদানিকৃত পণ্যের মান সনদ যাচাই করতাম। এই প্রথম বেসরকারি কোনো প্রতিষ্ঠানের নমুনা পরীক্ষা করলাম। প্রথম অভিজ্ঞতার কারণেই আমাদের এই পরিস্থিতিতে পড়তে হয়েছে। এরপর থেকে আমরা সতর্ক থাকবো। পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে আমরা কাস্টমসে বলেছি একটি চিঠি দিতে। যাতে আমরা ইমেইলেও মান সনদ পাঠাতে পারি। এতে করে জালিয়াতির সুযোগ থাকবে না। একইসঙ্গে সনদ জাল করার কারণে আমাদের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হয়েছে। তাই জড়িতদের বিরুদ্ধে আইনগত পদক্ষেপ নিতে আমি ইস্টার্ন রিফাইনারির ব্যবস্থাপনা পরিচালককে সুপারিশ করছি।