ভাসানচরে বাংলাদেশকে আন্তর্জাতিক সংস্থার সহায়তা করা উচিত: জাতিসংঘ

রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন পদ্মায় বুধবার দুপুরে পররাষ্ট্রমন্ত্রী এ কে আব্দুল মোমেনের সঙ্গে বৈঠক করেন জাতিসংঘের শরণার্থী সংস্থার দুই সহকারী হাইকমিশনার ছবি: সংগৃহীত

ভাসানচরে বাংলাদেশকে আন্তর্জাতিক সংস্থার সহায়তা করা উচিত: জাতিসংঘ

কক্সবাজারের সঙ্গে তুলনা করলে জীবনযাত্রার দিক দিয়ে ভাসানচরের রোহিঙ্গা প্রকল্পটিকে বেশ ভালো মনে করছে জাতিসংঘের শরণার্থী সংস্থা। রোহিঙ্গারা যাতে ভাসানচরে মর্যাদার সঙ্গে বসবাস করতে পারে, তা নিশ্চিত করতে জাতিসংঘ ও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের বাংলাদেশকে সহায়তা করা উচিত। আজ বুধবার দুপুরে রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন পদ্মায় পররাষ্ট্রমন্ত্রী এ কে আব্দুল মোমেনের সঙ্গে আলোচনার পর ব্রিফিংয়ে জাতিসংঘের শরণার্থী সংস্থার (ইউএনএইচসিআর) কার্যক্রম পরিচালনাবিষয়ক সহকারী হাইকমিশনার রাউফ মাজাও এ মন্তব্য করেন।

চার দিনের সফরে রাউফ মাজাও ও জাতিসংঘের শরণার্থী সংস্থার সুরক্ষাবিষয়ক সহকারী হাইকমিশনার গিলিয়ান ট্রিগস গত রোববার বাংলাদেশে আসেন। সফরের দ্বিতীয় দিনে গত সোমবার তাঁরা ভাসানচরের পরিস্থিতি দেখতে যান। এ সময় বিভিন্ন দাবিতে রোহিঙ্গারা তাঁদের সামনে বিক্ষোভ করে। ওই সময় বেশ কয়েকজন রোহিঙ্গা আহত হয়। এ নিয়ে ওই দিন সন্ধ্যায় জাতিসংঘের দুই জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা উদ্বেগ জানিয়ে বিবৃতি দেন।বিজ্ঞাপন

ভাসানচর ঘুরে আসার পর প্রকল্পটি নিয়ে প্রতিক্রিয়া জানতে চাইলে রাউফ মাজাও বলেন, বাংলাদেশ সরকার সেখানে গুরুত্বপূর্ণ বিনিয়োগ করেছে। জীবনযাত্রার বিষয়ে কক্সবাজারের সঙ্গে তুলনা করে বলা যায়, ভাসানচরের অবস্থা অনেক ভালো, বিশেষ করে আবাসনের যে ব্যবস্থা সরকার সেখানে করেছে।

রাউফ মাজাও বলেন, ‘যারা (রোহিঙ্গা) এখন ভাসানচরে আছে, আর যারা যাবে, তারা যেন মর্যাদার সঙ্গে বসবাস করতে পারে, তা নিশ্চিত করতে এখন আমাদের পাশাপাশি অন্যান্য আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাজ হচ্ছে বাংলাদেশ সরকারকে সমর্থন দেওয়া।’

জাতিসংঘের শরণার্থী সংস্থার কার্যক্রম পরিচালনাবিষয়ক সহকারী হাইকমিশনার বলেন, ‘একটি বিষয় কিন্তু স্পষ্ট যে আপনি যখন এ ধরনের দ্বীপে (ভাসানচর) বসবাস করতে থাকবেন, একধরনের বিচ্ছিন্নতাবোধ কাজ করে। তাই সেখানে অবশ্যই অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের ব্যবস্থা করতে হবে। অবশ্যই সেখানে আসা-যাওয়ার ব্যবস্থা থাকতে হবে। আশা থাকবে, এ ব্যবস্থা সাময়িক। পাশাপাশি এ প্রত্যাশাও থাকবে, তারা (রোহিঙ্গা) দ্রুত ফিরে যাবে।’

রাউফ মাজাও বলেন, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, জীবিকাসহ ভাসানচরে রোহিঙ্গাদের জন্য সবচেয়ে ভালো ব্যবস্থা যাতে নিশ্চিত করা যায়, সেটা মাথায় রাখতে হবে। সেখানে খালি জমি আছে, মাছ ধরার সুযোগ আছে। তারা যেন বসে না থাকে। অলস বসে থাকলে মেধার অপচয় হয়। এটা (ভাসানচর) একটা সুযোগ। একে কাজে লাগাতে হবে। তবে চূড়ান্ত লক্ষ্য হচ্ছে, বলপূর্বক যাদের বাস্তুচ্যুত করা হয়েছে, তাদের ফেরত পাঠানো।বিজ্ঞাপন

ভাসানচরে জাতিসংঘ খুব শিগগির যুক্ত হচ্ছে কি না, জানতে চাইলে রাউফ মাজাও বলেন, ‘এ বিষয়ে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে আমাদের আলোচনা হয়েছে। আমরা সব সময় সরকারের সঙ্গে কাজ করি। কক্সবাজারে আছি। ভবিষ্যতেও বাংলাদেশের বিভিন্ন জায়গায় থাকব। আমরা শরণার্থীদের জন্য সহায়তা নিশ্চিত করব।’

ভাসানচরে রোহিঙ্গাদের জন্য জাতিসংঘ তহবিল দেবে কি না, জানতে চাইলে রাউফ মাজাও বলেন, পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে আলোচনায় এ প্রসঙ্গ এসেছে। প্রায় ২০ হাজার রোহিঙ্গা সেখানে গেছে। তারা (জাতিসংঘ) রোহিঙ্গাদের জন্য সহায়তা দেবে।

রোহিঙ্গাদের তৃতীয় দেশে অন্তর্ভুক্তিকরণের বিষয়ে জানতে চাইলে জাতিসংঘের শরণার্থী সংস্থার সুরক্ষাবিষয়ক সহকারী হাইকমিশনার গিলিয়ান ট্রিগস বলেন, এ নিয়ে পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্দুল মোমেনের সঙ্গে কথা হয়েছে। সম্ভাব্য সুযোগ খতিয়ে দেখা যেতে পারে। তবে সেই সংখ্যা খুবই কম। কারণ, খুব বেশি ঝুঁকিতে থাকা লোকজন ও নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর জন্য এটা করা যেতে পারে। তবে মনে রাখতে হবে, এটা স্থায়ী সমাধান নয়। স্থায়ী সমাধান রোহিঙ্গাদের মর্যাদা ও নিরাপত্তার সঙ্গে তাদের আদি নিবাসে ফেরত যাওয়া। স্বল্প সময়ের জন্য সমাধান হিসেবে ভাসানচরের মতো চমকপ্রদ প্রকল্পকে কাজে লাগানো যেতে পারে, যাতে শিক্ষা ও জীবিকার মাধ্যমে তারা বিকশিত হতে পারে।

প্রত্যাবাসনের জন্য মিয়ানমারের সঙ্গে জাতিসংঘ কতটা যুক্ত আছে, জানতে চাইলে গিলিয়ান ট্রিগস বলেন, ফিরিয়ে নেওয়ার দায়িত্বটা মিয়ানমারের। বাংলাদেশ সরকার উদারতার সঙ্গে যথেষ্ট দায়িত্বশীল ভূমিকা নিয়েছে। মিয়ানমারে জাতিসংঘের শরণার্থী সংস্থার দপ্তর আছে। সেখানে তাঁরা কাজ করছেন। প্রত্যাবাসনের উপযোগী পরিবেশ তৈরির জন্য তাঁরা মিয়ানমারকে রাজি করানোর কাজ করছেন। তাঁদের কাজ মিয়ানমারকে সহায়তা করা। মিয়ানমারের বর্তমান পরিস্থিতিতে কাজটা একেবারেই কঠিন। তবে মিয়ানমারকে রাজি করাতে তাঁরা সর্বোচ্চ চেষ্টা করবেন।

পররাষ্ট্রমন্ত্রী এ কে আব্দুল মোমেন বলেন, ‘আমরা রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসন কিংবা তৃতীয় দেশে অন্তর্ভুক্তিকরণের বিষয়ে আলোচনা করেছি। কঠিন চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি তাদের সহায়তার জন্য। তবে চূড়ান্ত সমাধান হচ্ছে রোহিঙ্গাদের আদি নিবাসে ফিরে যাওয়া। চার বছর হলেও তারা যেতে পারেনি।’

মিয়ানমারের সামরিক জান্তার সঙ্গে জাতিসংঘের আলোচনা করা উচিত মন্তব্য করে পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ‘মিয়ানমারে মিলিটারি সরকার আসছে। এই সময় একটা সুযোগ তৈরি হয়েছে। কারণ, মিলিটারি সরকার কথা শুনবে। তাই তাদের ওপর তাঁরা (জাতিসংঘের কর্মকর্তা) যাতে অধিকতর চাপ দেন। এ সময় ওরা কথা শুনবে। রোহিঙ্গাদের যাওয়ার একটা পথ হবে।