রিয়াজ উদ্দিন মুন্নার গল্প : বর্ডার

ছুঁড়ে মারতেই সরে গেল দীর্ঘ সারির প্রথম মার্বেল টা। এখন সব গুলো মার্বেল বাবলুর। সারির প্রথম মার্বেল টা হল সব গুলোর মাথা। এটাকে সরাতে পারলেই সব গুলো দখলে চলে যায়।
আজ বাবলু এ পাড়ার মার্বেলের রাজা। পেপসির বোতলে ভরে অনেক গুলো লুকিয়ে রেখেছে বাঁশঝাড়ে। আর এখনো দু’পকেট ভরতি। দৌড় দিলে ঝনঝন শব্দ করে।কথা হচ্ছে এগুলো বাসায় নেওয়া যায় না; বাবা দেখলেই কপালে ঠ্যাংগানি নিশ্চিত।

হঠাৎ বর্ডারে একটা গুলির শব্দ হলো। মতিন এতক্ষণ মার্বেল খেলা দেখছিল।বলে উঠলো,কিরে! বর্ডারে তো গুলি হল।কথাটা শুনলেও খেলা ফেলে এদিকে মনোযোগ দেওয়া হয়নি বাবলুর।অন্য কেউ ও কোনো সাড়া দেয়নি।

বালবু ভাই, বাবলু ভাই বলে ছুটে আসছে অনিক। বাবলু পেছনে ফিরে তাকালো।মার্বেল চাইতে আসলে তো এভাবে আসার কথা না।গলার আওয়াজে বুঝা যাচ্ছে কোনো বিপদ।
কিরে!কি হয়ছে? চেচিয়ে উঠলো বাবলু।
ভাই,কাকারে বি এস এফ গুলি করছে।
কোথায়? কে বললো?
বাবলু আর্ত চিৎকার করে জিজ্ঞেস করল।
ডিপ মেশিনের কাছে।জাফর কাকা দৌড়ে এসে বলছে।মাথাটা নিচের দিকে দিয়ে উত্তর দিল অনিক।

হাতের মার্বেল গুলো ফেলে একটা দৌড় দিল বাবলু; সোজা বর্ডারের দিকে। রাস্তা থেকে নেমে ধান ক্ষেতের আইলে নামতেই চোখে পড়ল তার মাকে। হাটু সমান কাঁদা ভেঙে ঘোড়ার মত ছুটছে আসমা বেগম। কোথায় আঁচল কোথায় কি কোন হুঁশ নেই তার এখন। চিৎকার করে ছুটছে তো ছুটছেই।

খালের পাড়ে অনেকগুলো লোক ভীড় করে আছে।দুজনেই ছুটছে ওদিকে। অল্প সময়ের মধ্যেই মাকে ছাড়িয়ে গেল বাবলু। এর মধ্যে দুজনের চোখাচোখি হল কিন্তু কোন কথা নেই কারো মুখে।

ভীড় ঠেলে সামনে গেল বাবলু। কাত হয়ে পড়ে আছে তার বাবার মৃত দেহ। বুক বরাবর শার্ট টা ছিড়ে দুটি ক্ষত।বুক জুড়ে জমাট রক্ত। বাবলু তার বাবাকে জড়িয়ে ধরে একটা চিৎকার করে উঠলো,বা… বা….

মূর্ছা ভেঙে চোখ মেলল আসমা বেগম। বাবলু তার পাশে দাড়িয়ে আকাশের দিকে তাকিয়ে আছে। বাবলুকে জড়িয়ে ধরে হাউমাউ করতে কাঁদতে লাগল তার মা। ‘এই পোলা মাইয়া গুলারে এতিম করে কই গেল তর বাজান।অহন তরার কি অয়বো। এ তুমি কি করলা খোদা, এ তুমি কি করলা!’
বাবলু যেন দেখতে পেল কেউ একজন ভেঙে দিছে মার্বেল সারির মাথাটা। আশে পাশে ছিটকে গেছে কতগুলো মার্বেল।

লেখা: রিয়াজ উদ্দিন মুন্না,
শিক্ষার্থী, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।