রোহিঙ্গা দখলে টেকনাফ উখিয়ার শ্রমবাজার

রোহিঙ্গা দখলে টেকনাফ উখিয়ার শ্রমবাজার

মিয়ানমারের রাখাইন থেকে পালিয়ে আসা রোহিঙ্গাদের মানবিক কারণে কক্সবাজারের উখিয়া ও টেকনাফে আশ্রয় দিয়েছিল বাংলাদেশ। অথচ এখন এই দুই উপজেলার স্থানীয় বাসিন্দারাই রোহিঙ্গাদের কারণে নিজেদের ভবিষ্যৎ ও অস্তিত্ব নিয়ে উদ্বিগ্ন। তারা বলছেন, আশ্রয় পাওয়ার চার বছর পর এখন বিভিন্ন ক্যাম্পে অবস্থানকারী রোহিঙ্গারা এমন আচরণ করছে যেন তারাই এখানকার আসল অধিবাসী। কৃষি জমি, স্থানীয় শ্রমবাজার চলে যাচ্ছে তাদের দখলে। এতে উখিয়া ও টেকনাফসহ আশপাশের স্থানীয় মানুষের জীবনজীবিকা হুমকির মুখে পড়েছে।

জানা গেছে, রোহিঙ্গাদের ব্যাপারে প্রথমদিকে যে মনোভাব স্থানীয়রা পোষণ করেছিল, এখন তা আর নেই। বিশেষ করে আশ্রয় নেওয়ার চার বছর পরেও তারা নিজ দেশে ফিরে না যাওয়ায় টেকনাফ উখিয়ার স্থানীয়রা হতাশ। ২০১৭ সালের আগস্টের পর ওই রোহিঙ্গা ঢলের সময় স্থানীয়দের মধ্যে যারা নিজ জমি ও বাড়িতে এসব মানুষকে আশ্রয় দিয়েছিলেন, তারা এখন উল্টো পড়েছেন নিজেদের জমিজমা হারানোর শঙ্কায়। অনেকে হারানো জমি উদ্ধারে প্রধানমন্ত্রী পর্যন্ত আবেদনও করেছেন।

কক্সবাজার, উখিয়া ও টেকনাফ ঘুরে দেখা গেছে, রিকশা, অটোরিকশা, ব্যাটারিচালিত টমটম, মাহিন্দ্র গাড়ির চালক, খাবার হোটেল, আবাসিক হোটেল, গ্রামীণ অবকাঠামোগত উন্নয়ন কাজে, জেলেদের ফিশিং বোটে, বিভিন্ন প্রকার যানবাহনে ও ব্যবসা বাণিজ্যের উল্লেখযোগ্য কাজ এরইমধ্যে দখল করে নিয়েছে রোহিঙ্গারা। এমনকি গুরুত্বপূর্ণ টেকনাফের স্থলবন্দরের অভ্যন্তরেও রোহিঙ্গারা শ্রমিক হিসেবে কাজ করছে। শুধু উখিয়া বা টেকনাফ নয়, কক্সবাজার শহরেও রোহিঙ্গাদের শ্রমিক হিসেবে কাজ করতে দেখা গেছে। কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের মালিকদের সঙ্গে রোহিঙ্গা শ্রমিক নিয়োগ দেওয়ার বিষয়ে জানতে চাইলে তারা জানান, স্থানীয়দের চেয়ে রোহিঙ্গারা স্বল্প বেতনে কাজ করে। তাই তারা রোহিঙ্গা শ্রমিকদের কাজে নেন।

কথা হয় টেকনাফের ক্যাম্প ২৪ এর বাসিন্দা টমটম চালক রোহিঙ্গা আসমত উল্লাহর সঙ্গে। কিভাবে ক্যাম্পের বাইরে বের হলেন জানতে চাইলে তিনি বলেন, অনেক রোহিঙ্গাই টমটম, রিকশা ও সিএনজি চালায়। এমনকি বন্দরেও কাজ করে। কাজ শেষে আবার ক্যাম্পে ফিরে যায়। একইভাবে ক্যাম্প ২৬ এর রোহিঙ্গা মোহাম্মদ ইয়াকুবও জানান, বাংলাদেশি মালিকের কাছ থেকে টমটম নিয়ে চালাচ্ছেন তিনি।

উখিয়ার পালংখালীর একটি চা দোকানে কথা হয় স্থানীয় বাসিন্দা আব্দুস সালামের সঙ্গে। ক্ষোভ প্রকাশ করে তিনি বলেন, রোহিঙ্গারা আমাদের জমি, ক্ষেতের ফসল সব দখল করে নিয়েছে। সংরক্ষিত বনের পাশে দুই একর জমিই ছিল আমার জীবিকার প্রধান অবলম্বন। এ জমিতে ধান ও সবজি চাষ করে পরিবারের সদস্যদের নিয়ে সুখে ছিলাম। এখন রোহিঙ্গারা সেই সুখ কেড়ে নিয়েছে। দুই একর জমির পুরোটাই রোহিঙ্গাদের দখলে। আমার মতো এমন আরও অনেকের জমি রোহিঙ্গারা দখলে নিয়েছে।

উখিয়ার জামতলা ক্যাম্পের ভিতর ঢুকতেই চোখে পড়ে মোড়ে মোড়ে বাজার বসেছে। টাটকা শাক-সবজি মাছ কিনে ঘরে ফিরছে রোহিঙ্গারা। ইউএনএইসসিআর বা আইওএমের তৈরি করে দেওয়া ঘরের একপাশ ব্যবহৃত হচ্ছে থাকা-খাওয়ার কাজে, অন্য পাশ দোকানদারিতে। এসব ছোটখাটো দোকান ছাড়াও ক্যাম্পের মধ্যে বেশকিছু বড় স্থায়ী বাজার গড়ে উঠেছে। খাবার হোটেল থেকে শুরু করে জুয়েলারির দোকান সবই আছে এই বাজারে। সেখানে যেমন মিলছে ইলেকট্রনিকস পণ্য, জামা-কাপড়, জুতা, ওষুধ, জ্বালানি কাঠ, গ্যাসের সিলিন্ডার, একইভাবে পাওয়া যাচ্ছে দা-বটি-কুড়ালের মতো ধারাল অস্ত্রও। বাজার ঘুরে দেখা যায়, সেখানকার অন্তত ৪০ ভাগ পণ্যই মিয়ানমারের। বাকি পণ্যের (বিশেষ করে খাদ্যপণ্য) অর্ধেকই বিভিন্ন সংস্থার কাছ থেকে পাওয়া ত্রাণসামগ্রী, যা নিজেদের প্রয়োজনের তুলনায় বেশি হওয়ায় বিক্রির জন্য দোকানে তুলেছে তারা।

স্থানীয় বাসিন্দারা জানিয়েছেন, রোহিঙ্গাদের কারণে টেকনাফ ও উখিয়ায় সব ধরনের নিত্য প্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের দাম বেড়েছে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে এই বৃদ্ধির হার দ্বিগুণ-তিনগুণ। আগে যে সবজি ২০ থেকে ৩০ টাকায় কেনা যেত, এখন সেটি কিনতে হচ্ছে ৫০ থেকে ৬০ টাকায়। যাতায়াত খরচও বেড়েছে কয়েকগুণ। আগে যেখানে কক্সবাজার থেকে টেকনাফ যেতে অটোরিকশা ভাড়া নিত আড়াইশ থেকে তিনশ টাকা নেওয়া হতো, এখন ওই দূরত্বে গুনতে হচ্ছে ৬০০ থেকে ৭০০ টাকা। বাসে যাতায়াত করতে গিয়েও বাড়তি ভাড়া দিতে হচ্ছে।

এদিকে উখিয়া উপজেলার পালংখালী ইউনিয়নের বালুখালী এলাকার ১০ বাসিন্দা ক্যাম্পের মধ্যে পড়া তাদের জমি উদ্ধারে প্রধানমন্ত্রী বরাবর আবেদন করেছেন। আবেদেন বলা হয়েছে, তাদের নিজস্ব নামীয় জমিতে তৈরি হয়েছে রোহিঙ্গাদের বসতি। তাদের জমিতে বর্তমানে হাজার রোহিঙ্গা পরিবার বাস করছে। এখন হয় ক্ষতিপূরণ বা জমি উদ্ধার চান তারা। আবেদনকারী গফুর উল্লাহ ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, রোহিঙ্গারা আমাদের জমি, ক্ষেতের ফসল সব দখল করে নিয়েছে। দেশি-বিদেশি ত্রাণ নিয়ে এখন তারা আমাদের ওপর চড়াও হচ্ছে। নিজ দেশে এখন আমরা শরণার্থী।

সামগ্রিক বিষয়ে শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনার শাহ রেজওয়ান হায়াত আমাদের সময়কে বলেন, ‘উখিয়া ও টেকনাফের বিশাল একটি জায়গা জুড়ে রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দেওয়ায় এর প্রভাব স্থানীয়দের ওপর পড়েছে। একইসঙ্গে এই এলাকায় পরিবেশের ভারসাম্যও নষ্ট হচ্ছে। তাছাড়া ক্যাম্প থেকে বেরিয়ে রোহিঙ্গারা বিভিন্ন জায়গায় শ্রমিকের কাজ করছে। রিকশা, টমটম, সিএনজি অটোরিকশা চালাচ্ছে। বিভিন্ন সময় এটার বিরুদ্ধে অভিযান পরিচালনা করা হয়। আমরা চেষ্টা করে যাচ্ছি যেন রোহিঙ্গারা ক্যাম্পের বাইরে না আসতে পারে।

ক্যাম্পের ভিতরে বাজার বসিয়ে পণ্য কেনাবেচার বৈধতা আছে কিনা এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, ক্যাম্পে কোনো ধরনের বাজার স্থাপনের অনুমতি নেই। আমরা ইতিমধ্যে কয়েকটি বাজার উচ্ছেদ করেছি। পর্যায়ক্রমে সবগুলো উচ্ছেদ করব। তবে এতে আমরা কিছু সমস্যায় পড়ি। দেখা যায় উচ্ছেদকালে বাংলাদেশি কেউ সেই দোকানের মালিকানা দাবি করে।

উখিয়ার পালংখালী ইউনিয়নের চেয়ারম্যান গফুর উদ্দিন চৌধুরী বলেন, তাদের বসতভিটা, ফসলের ক্ষেত, সামাজিক বনায়ন, এমনকি শ্রমবাজার সব রোহিঙ্গাদের দখলে। আমার নিজের ৩ একর জমিও রোহিঙ্গারা দখলে নিয়েছে। তবে তাদের কারণে সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে এখানকার শিক্ষাব্যবস্থা। কারণ স্কুল কলেজগুলোতে বিভিন্ন সংস্থা অফিস করেছে। তাছাড়া ক্যাম্পে কর্মরত বিভিন্ন এনজিও উচ্চ বেতনে লোক নিয়োগ দেওয়ায় শিক্ষক পাওয়া যাচ্ছে না।

তিনি জানান, রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দেওয়া হয়েছে উখিয়া ও টেকনাফের পাঁচটি ইউনিয়নে। এগুলো হলো-উখিয়া উপজেলার রাজাপালং ও পালংখালি ইউনিয়ন এবং টেকনাফের হোয়াইক্যং, হ্নিলা ও বাহারছড়া। এসব ইউনিয়নের প্রায় দুই লাখ লোক এখন চরম বিপদের মধ্যে রয়েছে। এখানে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি হচ্ছে। যত দিন যাচ্ছে, রোহিঙ্গারা সহিংস হয়ে উঠছে। কথায় কথায় তারা স্থানীয় লোকজনের ওপর চড়াও হয়। রোহিঙ্গারা নানা অপরাধ করলেও তাদের পুলিশে দেওয়া যায় না। তাদের নিয়ন্ত্রণের কোনো ব্যবস্থা নেই বিশাল ক্যাম্পে। এ অবস্থায় আতঙ্ক নিয়ে বসবাস করছেন স্থানীয় মানুষ।